• ঢাকা
  • সোমবার, ৩১ আগষ্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. অপরাধ

আইনশৃঙ্খলা : সরকারের ব্যর্থতা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র?


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ৩১ আগষ্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০১:১১ পিএম;
আইনশৃঙ্খলা : সরকারের ব্যর্থতা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র?

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে হঠাৎ করেই জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চেয়ে কয়েকটি  হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধের ঘটনা সারাদেশের মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। 

গত শনিবার ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে পড়ে রনজিনা পারভীন (৫৫) নামে এক প্রধান শিক্ষিকার মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে এসে ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। জাতীয় সংসদের অধিবেশন যখন চলছে ঠিক সেই সময় সংসদের সামনে এধরনের ঘটনা কি নিছকই ছিনতাইয়ের জন্য নাকি খবরের শিরোনাম হবার জন্য?

ছিনতাইয়ের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। যে ঘটনাটি শনিবার সংসদ ভবনের সামনে ঘটেছে সেরকম ঘটনাও বিভিন্ন সময় ঘটেছে। কিন্তু এটা করা হয়েছে সংসদ ভবনের সামনে, একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয়ার জন্য। এই ঘটনার পর যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে তা হলো, সংসদ ভবনের মতো সুরক্ষিত জায়গায় যদি কেউ নিরাপদ না থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নটি যেন ওঠে সেজন্যই কি পরিকল্পিত ভাবে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটানো হয়?

এর আগের সপ্তাহে, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুরের দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ দাবি করে, ওই দুই ব্যক্তিই গনপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে একে একে হত্যা করেছে। পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। 

এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কী-না, নিহত একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কী-না, মাদকাসক্ত দুইজন মানুষ চারজনকে হত্যা করতে পারে কী-না, খুনি সন্দেহে গ্রেফতার ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার একই রকম শার্ট কেন, আসলেই মাদক গ্রহণে বাধা দেয়ায় হত্যাকাণ্ড নাকি এটি ডাকাতির ঘটনা-এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের পরও কেন আসামিরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল, নিহতদের শরীরে বা পোশাকে কিংবা ঘটনাস্থলে আসামিদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কী না এমন প্রশ্নও উঠছে। 

সেই সাথে, নিহত গনপতি চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভাঙ্গা ছিল কী-না তা নিয়ে পুলিশ ও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের অমিল নিয়েও প্রশ্ন ও সন্দেহের কথা বলছেন কেউ কেউ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এ ঘটনা নিয়ে এত সন্দেহ ও অবিশ্বাস?

চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা বিশেষত অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল পুলিশের তদন্ত। 

এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলা, কুমিল্লার তনু হত্যা, মেজর সিনহা হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলাসহ আরো বেশ কিছু মামলার তদন্ত নানা সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। 

অনেক সময়ই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুমান নির্ভর বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
স্পর্শকাতর ইস্যুতে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একেক অফিসার, একেক এজেন্সি প্রধান একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিশাল একটা সংশয় তৈরি হয়ে যায়। রংপুরের ঘটনা তাঁর সর্বশেষ উদাহরণ। খতিয়ে দেখা দরকার যে, রংপুরের চার খুন নিয়ে পুলিশের বয়ান কী নিছকই অভিজ্ঞতার অভাব নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। কারণ, রংপুর এখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্বে চলে গেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বিএনপি পেলেও রংপুরের চাবি বিরোধীদের হাতে। এখানে এখন প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত সব চলে বিরোধী দলের নেতাদের নির্দেশে। কাজেই রংপুরের ঘটনাকে নিছক একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করলে তা হবে ভুল। এর পিছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার মূল কারণ। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রাজপথে এসে ঠেকেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ২৪ এর আগস্টের দায়িত্ব গ্রহণ পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোন পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো মব, দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাটের ঘটনাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ইউনুস সরকারের পাঁচ অপকর্মকে দায়ী করা যায়।

প্রথমত, ইউনুস ক্ষমতায় এসেই জেল থেকে চিহ্নিত ও দণ্ডিত অপরাধীদের মুক্তি দেন। এদের মধ্যে অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী, অনেকে জঙ্গি সংগঠনের নেতা। এদের ঢালাও ভাবে মুক্তি দেয়ার ফলে তারা এখন নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে, এরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী।

দ্বিতীয়ত, মব সন্ত্রাসের জনক হলো ড. ইউনূস। ড. ইউনূসের শাসনকালে বাংলাদেশে মব সন্ত্রাস মহামারী আকার ধারণ করে। একটি গোষ্ঠী মব সৃষ্টি করে রাষ্টীয় মদদে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা করে। বিভিন্ন ব‍্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারের নাকের ডগায়। এসব ঘটনার ফলে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এখনও যারা সক্রিয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য এরা অনেকাংশেই দায়ী।

তৃতীয়ত, ইউনূসের আমলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। রাস্তাঘাটে মানুষকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করা হলেও তার বিচার করা হয়নি। মব করে মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়া হলেও তার বিচার হয়নি। সারাদেশে হাজার হাজার মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙচুর করা হলেও তার বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ।

চতুর্থত, ইউনূস সরকার তাদের দেড় বছরের শাসনকালে পুলিশ বাহিনীকে নিস্ক্রিয় করে রাখে। ২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ছিলো তলানিতে। ইউনূস সরকারের আমলে কিছু পদক্ষেপ সেই মনোবল আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ বাহিনীকে পদে পদে অপমান করার ফলে তারা মোটামুটি নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সেই অবস্থা থেকে এখনও বের হতে পারেনি তারা।

পঞ্চমত, আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা ছিল ইউনূস সরকারের অন‍্যতম বৈশিষ্ট্য। ৫ আগস্টের পর কিছু তরুণ ও যুবক হয়ে উঠে দেশের মালিক। তারা যা ইচ্ছে করতে থাকে। আইন ও বিচারের উর্ধ্বে উঠে যায় তারা। এর মাধ্যমে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি চরম অবমাননা করা হয়।  এখান থেকে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করা কঠিন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পরিকল্পিত ভাবে কিছু ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যাতে এই সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। বিদ‍্যুৎ ও জ্বালানি সংকট  তৈরির নেপথ্যে একটি বিশেষ মহলের হাত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর পেছনেও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। তাই সরকারকে সাবধানে চোখ কান খোলা রেখে কাজ করতে হবে। কোন ধরনের উসকানিতে পা দেয়া যাবে না। সরকারের ভেতরে যারা কথা বলেন, তাদের সংযত ভাষায় কথা বলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সরকারকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

দৈনিক পুনরুত্থান / বিশেষ প্রতিনিধি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন