• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০ টাকায় প্রজন্ম গড়ার কারিগর এলাহির পাশে মানবিক ইউএনও সুজা


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৩৪ পিএম;
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০ টাকায় প্রজন্ম গড়ার কারিগর এলাহির পাশে মানবিক ইউএনও সুজা

বিশেষ প্রতিনিধি :

 

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ এ একজন গুনি শিক্ষকের সন্ধানে ১০ টাকায় প্রজন্ম গড়ার কারিগর এলাহির পাশে দাড়াতে ছুটে গেলেন মানবিক ইউএনও সুজা। 

সোমবার (০৫ অক্টোবর ২০২৬) বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুন্ড গ্রামের মনিরুজ্জামান এলাহীর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিলেন ইউএনও মোহাম্মদ আলী সুজা।

শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট দেয়াল থাকে না, থাকে না কোনো বস্তুগত মূল্য। একখণ্ড কাঠের পাটি, দোয়াতের মেটে কালি আর জরাজীর্ণ পুরোনো কাগজে হাজারো শিশুর চোখে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন যিনি, জীবনের সায়াহ্নে এসে সেই মানুষটির নিজের জীবনই আজ এক অবহেলার রূপকথা।
​বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুন্ড গ্রাম। নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে এই গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া শিশুদের কাছে মনিরুজ্জামান এলাহী কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন অন্ধকারের বুকে আলোর প্রদীপ। পারিশ্রমিক বলতে কিছুই চাওয়া ছিল না, যা পেতেন তা হয়তো সাকুল্যে দশটি টাকা। এলাকার মানুষ তাই তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় ডাকেন ‘দশ টাকার মাস্টার’। যে বয়সে সাধারণ মানুষ নিজের সংসার, ভবিষ্যতের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত থাকে, সে বয়সে তিনি নিজের জীবনের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন অন্যের সন্তানের ঘরে। ভালোবেসে বিয়েও করেননি; শিক্ষাদানকেই করেছিলেন জীবনের একমাত্র তপস্যা।
​অক্ষরজ্ঞানের যে কঠিন ভিত তিনি সেদিন গড়ে দিয়েছিলেন, তার ওপর ভর করে তাঁর অগুনতি শিক্ষার্থী আজ সফলতার শিখরে। কেউ সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, কেউবা আবার প্রবাসে দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। অথচ প্রদীপের নিচটা যেমন অন্ধকারেই থেকে যায়, তেমনি এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হস্তিশুন্ড গ্রামের এই কৃতিমান পুরুষ।
​জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বয়সের ভার ও নিদারুণ আর্থিক টানাপোড়েনে একদম নিঃস্ব মনিরুজ্জামান এলাহী। কোনো স্থায়ী আয় নেই, নেই সরকারি কোনো ভাতা বা নিয়মিত সাহায্য। নিজের তৈরি করা সোনালী অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো জরাজীর্ণ বাড়িতে আজ তাঁর নিঃসঙ্গ বসবাস। নড়বড়ে দরজা-জানালা আর ধসে পড়া দেয়ালের মাঝে যে নীরবতা, তাতে একসময়কার সেই মুখরিত পাঠশালার কোলাহল যেন অতল গভীরে হারিয়ে গেছে।
​এইচ. এম. ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক নুরুল ইসলাম মোল্লা স্মৃতিচারণ করে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “একজন মানুষ কতটা নিঃস্বার্থ হলে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে একটি প্রজন্মকে আলো দেখাতে পারেন, এলাহি স্যার তাঁর জ্বলন্ত প্রমাণ। আজকের অনেক প্রতিষ্ঠিত মানুষের হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁরই আঙুল ধরে।”
​সম্প্রতি এই প্রবীণ শিক্ষকের নির্মম কষ্টের গল্পটি প্রকাশ্যে এলে তা নজরে আসে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সেই অনাথ শিক্ষাগুরুর পাশে দাঁড়াতে কালবিলম্ব না করে হস্তিশুন্ড গ্রামে ছুটে যান উজিরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলী সুজা।
​শিক্ষক দিবসের মহতি দিনে প্রবীণ এই কারিগরের ঘরে উপস্থিত হয়ে ইউএনও নিজেই তাঁর জরাজীর্ণ বাসস্থান ঘুরে দেখেন, খোঁজ নেন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের। আবেগঘন পরিবেশে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসা ও নিয়মিত আর্থিক সহায়তার সুদৃঢ় আশ্বাস দেন ইউএনও।
​উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “যিনি জীবনের সবটুকু সময় একটি গোটা প্রজন্মকে গড়ার পেছনে বিলিয়ে দিয়েছেন, শেষ বয়সে এসে তাঁর পাশে দাঁড়ানো কেবল প্রশাসনের নয়, পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।” সেই সাথে এলাহীর গড়ে তোলা সাবেক সফল শিক্ষার্থী ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের প্রিয় শিক্ষকের সাহায্যে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
​যে মানুষটি কত শত শিশুকে ‘অ’, ‘আ’ শিখিয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন—তাঁর হয়তো কোনো রাজকীয় পদবি বা সনদ নেই, কিন্তু তিনি ছিলেন হাজারো জীবনের প্রথম দিশারী।
​উজিরপুরের মানবিক ইউএনও মোহাম্মদ আলী সুজা শ্রদ্ধার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পথ দেখিয়ে গেলেন, এখন প্রশ্ন থেকে যায়—যাঁদের জীবনের প্রথম অক্ষরের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন এই ‘দশ টাকার মাস্টার’, সেই সফল সাবেক শিক্ষার্থীরা কবে ফিরবেন তাঁদের শৈশবের সেই প্রথম শিক্ষাগুরুর ভালোবাসার ঋণ মেটাতে?

 

মিজান উর রহমান

সহযোগী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

দৈনিক পুনরুত্থান

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন