রক্ত,রাজনীতি ও প্রতিরোধের ভাষা: মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার লড়াই এবং মুসলিম বিশ্বের আত্মসম্মানের প্
নজরুল ইসলাম আলীম:
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখনই যুদ্ধবিমান গর্জে ওঠে, তখন শুধু একটি রাষ্ট্র নয়—একটি ইতিহাস, একটি আদর্শ এবং একটি জাতিগত আত্মপরিচয় কেঁপে ওঠে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, এই অঞ্চল এখনো বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার দাবার ছক।অনেকের কাছে এটি কেবল ভূরাজনীতি। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের এক বড় অংশের কাছে এটি আত্মমর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন।“স্থিতিশীলতা”র সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে?উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত—দশকের পর দশক ধরে একই শাসন কাঠামো বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা “স্থিতিশীল মিত্র” হিসেবে বিবেচিত। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র–এর।সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন: কেন কিছু রাষ্ট্রে রাজতন্ত্র গ্রহণযোগ্য, কিন্তু অন্য কোথাও শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী বা ইসলামপন্থী নেতৃত্বকে “হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়? স্থিতিশীলতার মাপকাঠি কি গণতন্ত্র, নাকি কৌশলগত আনুগত্য?নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক রাজনীতি ও দ্বৈত মানদণ্ড ইরান বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোর গভীর আপত্তি রয়েছে। তেহরান বলছে, এটি শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উন্নয়নের অংশ; সমালোচকেরা বলেন, আন্তর্জাতিক আস্থার ঘাটতি রয়েছে।কিন্তু একই অঞ্চলে ইসরায়েল–এর পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে তুলনামূলক নীরবতা বহু মুসলিম দেশে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই বৈপরীত্য অনেকের চোখে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রতীক।পতনের ইতিহাস, প্রতিরোধের বয়ান গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় একাধিক শক্তিশালী নেতা ক্ষমতা হারিয়েছেন। সাদ্দাম হোসেন–এর পতন ছিল সামরিক হস্তক্ষেপের ফল; মুয়াম্মার গাদ্দাফি–এর পরিণতি গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অভিযানের মিশ্রণ; হোসনি মোবারক আরব বসন্তের গণআন্দোলনে সরে দাঁড়ান; বাশার আল-আসাদ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্যে ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন; আর দক্ষিণ এশিয়ায় ইমরান খান–এর রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়েছে।সমর্থকেরা মনে করেন, এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব ছিল; অন্য বিশ্লেষকেরা বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল মুখ্য। সত্যটি সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও—অভ্যন্তরীণ সংকট ও বহিরাগত প্রভাবের জটিল মিশ্রণে।গাজা উপত্যকা বারবার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বলছে; অন্যদিকে নিরাপত্তা উদ্বেগের যুক্তিও তুলে ধরা হচ্ছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভক্ত অবস্থান আজও সমাধানকে দূরে ঠেলে রাখছে।
রমজান হোক বা অন্য সময়—যখন বোমা পড়ে, তখন ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক বেদনা একাকার হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তখন মানুষের কান্নাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না।নতুন প্রভাববলয় নাকি পুরনো ঔপনিবেশিকতার ছায়া?অনেক সমালোচক বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে “নতুন প্রভাববলয় রাজনীতি” বলে আখ্যা দেন—যেখানে সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত জোট রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের মতে, এটি সরাসরি উপনিবেশ নয়, কিন্তু প্রভাব ও নির্ভরতার জাল একইভাবে কাজ করে।তবে বাস্তবতা হলো, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যও অস্থিরতার বড় কারণ। কেবল বহিরাগত শক্তিকে দায়ী করলেই পুরো চিত্র সম্পূর্ণ হয় না।মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়—এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। দ্বৈত মানদণ্ড, সামরিক সমাধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন আন্তরিক কূটনৈতিক সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইনের সমান প্রয়োগ এবং মানবাধিকারের প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি।
ইতিহাস দেখিয়েছে, শক্তি দিয়ে ক্ষমতা অর্জন করা যায়; কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়িত্ব আসে না। মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ হয়তো আজও সেই ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যতের অপেক্ষায়—যেখানে সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও শান্তি একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: