চতুর্থ স্তম্ভের শক্ত ভিত গড়তে প্রয়োজন মানদণ্ডভিত্তিক সাংবাদিকতা আইন
নজরুল ইসলাম আলীম:
গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে সাংবাদিকতাকে দীর্ঘদিন ধরেই “জাতির চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়। রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ—আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যম সমাজের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্ন উঠছে—এই মহৎ পেশার মান ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন?বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংবাদিকতার পরিচয়ে অসংখ্য ব্যক্তি কাজ করছেন, যাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—অপর্যাপ্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাব, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রের অপব্যবহার। কোথাও কোথাও সাংবাদিকতার আইডি কার্ড সংগ্রহ করে প্রশাসনিক দপ্তর, অফিস-আদালতে অনৈতিক প্রভাব খাটানো, চাঁদাবাজি বা দালালির মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অনিয়ম কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং পুরো পেশার সুনাম ক্ষুণ্ণ করে এবং প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, নৈতিকতা ও পেশাগত দক্ষতা। একজন পেশাদার সাংবাদিকের থাকতে হবে ইতিহাস, আইন, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা ও মানবাধিকার সম্পর্কে মৌলিক ধারণা। তথ্য যাচাই, সূত্রের সুরক্ষা, মানহানির ঝুঁকি, ডিজিটাল নিরাপত্তা—এসব বিষয়েও থাকতে হবে পর্যাপ্ত জ্ঞান। কেবল পরিচয়পত্র নয়, প্রকৃত সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো প্রশিক্ষণ ও নৈতিক প্রতিশ্রুতি।এ প্রেক্ষাপটে অনেক সচেতন নাগরিক মনে করেন, জাতীয় সংসদে একটি সমন্বিত ও সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করে সাংবাদিকতার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত রাখা অত্যন্ত জরুরি—যাতে সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না হয়। মানদণ্ড নির্ধারণের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নৈতিক আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ।
বিশ্বের অনেক দেশে সাংবাদিকদের জন্য পেশাগত নীতিমালা ও স্ব-নিয়ন্ত্রিত কাউন্সিল ব্যবস্থা রয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রেখেই জবাবদিহি নিশ্চিত করে। আমাদের দেশেও অনুরূপ একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তোলা গেলে পেশায় শৃঙ্খলা ফিরবে, অপেশাদার ও অসৎ চর্চা কমবে এবং জনআস্থা বাড়বে।সাংবাদিকতা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি দায়িত্ব, সততা ও সাহসের পেশা। সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার, অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে হলে গণমাধ্যমকে হতে হবে শক্ত, স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ। আর সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রশিক্ষণ ও আইনি কাঠামো—যা সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করবে এবং জাতির চতুর্থ স্তম্ভকে আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- চতুর্থ* স্তম্ভের,শক্ত
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: