পটুয়াখালীর গলাচিপায় মরদেহ সংরক্ষণে বরফ মেলেনি, ইউএনওর হস্তক্ষেপে সংকট নিরসন
পটুয়াখালী প্রতিনিধি :
মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে বরফকল বন্ধ থাকায় মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য বরফ না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ে এক পরিবার। শহরের চার-পাঁচটি বরফকল ঘুরেও খালি হাতে ফিরতে হয় স্বজনদের। অবশেষে উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও জেলা প্রশাসনের বিশেষ অনুমতিতে সংগৃহীত বরফে মেটে সংকট।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌর শহরের খেয়াঘাট এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, মৃত ব্যক্তির নাম মো. বেল্লাল সরদার (৪০)। তিনি উপজেলার উত্তর চরকাজল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জ্বর ও কিডনিসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তিন দিন আগে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হলেও পরে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে তিনি মারা যান।
স্বজনরা জানান, বরিশাল থেকে মরদেহ নিয়ে চরকাজল গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিতে হবে। দূরদূরান্তে থাকা স্বজনদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দিতে এবং দাফনের প্রস্তুতি নিতে বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গরমের মধ্যে মরদেহের দ্রুত অবনতি হওয়ায় বরফের জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে গলাচিপা শহরের অন্তত চার থেকে পাঁচটি বরফকলে ঘুরেও মালিকরা সব কারখানা বন্ধ রয়েছে জানিয়ে বরফ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটি গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) শরণাপন্ন হয়। খবর পেয়ে ইউএনও জেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেন। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ফারুকুজ্জামানকে বরফকলে পাঠানো হয়। তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে একটি বরফকল থেকে প্রয়োজনীয় বরফ সংগ্রহ করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এতে স্বজনদের মধ্য থেকে উদ্বেগ কেটে যায় এবং মরদেহ নিজ গ্রামে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞার সময় সীমিত পরিসরে একটি বরফকল চালুর ব্যবস্থা থাকে, যেন জরুরি প্রয়োজন মেটানো যায়। তবে এবার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে অন্তত একটি বরফকল বিশেষ নজরদারিতে চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা, যাতে এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে লাশ সংরক্ষণ ও চাষের মাছ পরিবহনে জটিলতা না তৈরি হয়।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মোহাম্মদ ইজাজুল হক জানান, “বিষয়টি জানার পর আমরা দ্রুত জেলা প্রশাসনে জানাই। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নির্ধারিত বরফকল থেকে প্রয়োজনীয় বরফ সংগ্রহ করে দিয়ে কারখানাটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”
বরফকলের মালিক জানান, “মা ইলিশ সংরক্ষণে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব বরফকল বন্ধ রয়েছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও মরদেহের জন্য বরফ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। গত দুদিনে আরো দুটি মৃতদেহের বরফের জন্য লোক এসেছিল, কিন্তু অনুমতি না থাকায় দেওয়া যায়নি। এছাড়া একটি বরফকলও খোলা না থাকায় স্থানীয় চাষের মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহন নিয়েও ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়েছেন।”
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “জেলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মা ইলিশ রক্ষা ও অসাধু মাছ শিকার বন্ধে সব বরফকলের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার পুরো মেয়াদে এই নির্দেশ বহাল থাকবে।”
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: