২০২৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কৌশল ভেস্তে দিল অন্তর্বর্তী সরকার
ডিপ স্টেটের’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ২০২৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কৌশল ভেস্তে দিল অন্তর্বর্তী সরকার—আসিফ মাহমুদ
নজরুল ইসলাম আলীম:
রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেছেন, প্রভাবশালী ‘ডিপ স্টেট’ মহল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের প্রশ্নে সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথকেই অগ্রাধিকার দেন।বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকেই বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান—যাদের তিনি ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে উল্লেখ করেন—অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করা।তিনি আরও জানান, প্রস্তাবের অংশ হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশল বা ‘রোডম্যাপ’ও উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার নানা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে তারেক রহমান-এর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে তাকে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা ছিল। আদালতের তারিখ ঘুরিয়ে দেওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ করার মাধ্যমে সাজা বহাল রাখার কৌশলও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানান তিনি।আসিফ মাহমুদ বলেন, “যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকেন, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সেই সুযোগটাই কাজে লাগানোর একটি পরিকল্পনা ছিল। ফলে নির্বাচন হলেও তা কার্যত একপাক্ষিক হয়ে যেত, এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি বৈধতা তৈরি করা যেত।”তিনি আরও দাবি করেন, ‘ডিপ স্টেট’-এর পক্ষ থেকে শুধু কৌশলই নয়, কিছু শর্তও দেওয়া হয়েছিল। এসব শর্তের মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব ও সুবিধা নিশ্চিত করা। বিনিময়ে তারা সরকারকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করার আশ্বাস দেয়।তার ভাষ্যমতে, এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে একটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে বলা যেত যে, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সরকার বহাল থাকা উচিত। এতে করে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার একটি ‘বৈধ কাঠামো’ তৈরি করা সম্ভব হতো। কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের কোনো সমঝোতায় যায়নি।“আমরা মনে করেছি, এমন প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে এবং গণতন্ত্রের মূল চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই আমরা ক্ষমতায় থাকার লোভে না পড়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নিজেরাই পদত্যাগ করেছি,”—বলেন তিনি।
বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গ টেনে আসিফ মাহমুদ বলেন, যারা একসময় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগের প্রশ্ন তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছিল, তারাই এখন আগের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে নির্বাচনী নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি অভিযোগ করেন, “যাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল, তাদেরই পুরস্কৃত করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে, রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, যা নির্বাচনের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।”এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে পরিচিত শক্তিগুলোর প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে তারা নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে একটি গ্রহণযোগ্যতার বয়ান তৈরি করতে পারত। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মহলে তখন এটি উপস্থাপন করা যেত যে, সংবিধান অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বহাল আছে।
সভায় এনসিপির অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন এবং তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার রাজনীতির অন্তর্নিহিত কৌশল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- ২০২৯* পর্যন্ত,ক্ষমতায়
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: