• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

সাংবাদিকতা নিয়ে দুটি কথা


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৪:১১ পিএম;
সাংবাদিকতা নিয়ে দুটি কথা

সাংবাদিকতা একটি মহান দায়িত্বপূর্ণ পবিত্র সেবামূলক কর্ম। যার যোগ্যতা শুধু একাডেমী শিক্ষা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাংবাদিকের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা, আত্মকেন্দ্রিক হীনতা, দেশের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়ার মানসিকতা, ন্যায় বোধ সম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িকতা চিন্তা চেতনার ধারণ যোগ্যতা থাকতে হয়। তাকে জানতে হয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ,সামাজিক প্রথা, রীতি নীতি ,সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, আইন ,বিচার ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে। সেক্ষেত্রে তার যোগ্যতা একাডেমীক সনদের উপর যেমন শুধু নির্ভর করে না তেমনি ভাবে একেবারেই শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও হয় না। ‌ লেখায় অনেক ভাষার ম্যার প্যাঁচ থাকে তেমনি যখন একজন ব্যক্তি সাক্ষাৎকার দেয় সেই সাক্ষাৎকারে কথার দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। সর্ব বিষয়ে একজন সাংবাদিকদের জ্ঞান অর্জন করতে হয়। একজন সাংবাদিকের যদি সর্ব বিষয়ে কমবেশি জ্ঞান না থাকে তাহলে সে সাংবাদিকতা করতে পারে না। সেটা যেমন টিয়া পাখির মত মুখস্ত বিদ্যার সনদ অর্জন করলেই সম্ভব না তেমনি ভাবে চিন্তা চেতনা ভাবনা উন্নত মানসিকতার না হলে তা দিয়েও সম্ভব না। সর্বোপরি সাংবাদিকতা একটি মহান সেবামূলক পেশা। কিন্তু শুধু পেশা হিসেবে নিলেই হবে না এটাকে নেশা হিসেবেও নিতে হবে। 

সাংবাদিকের একটা সংবাদ পরিবর্তন করে দিতে পারে একটি দেশকে। ধ্বংসের মুখে ঢেলে দিতে পারে একটি জাতিকে। একটি সরকারকে করে দিতে পারে উল্টোপাল্টা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পৃথিবীতে সৃষ্টি হতে পারে ক্রাসের রাজত্ব। বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থের বিনিময়েও যার মাপকাঠি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সাংবাদিকের সংবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রকে করে তুলতে পারে শান্ত এবং অশান্ত। তাই সাংবাদিক হলো মুকুটহীন সম্রাট। যোগ্যতা প্রয়োজন হয় আকাশ চূর্ণ। সুতরাং সাংবাদিকের নবীন এবং প্রবীণদের ব্যাপক পার্থক্য। কোন সাংবাদিককে অর্থ দিয়ে মাপকাঠি পরিমাপ করা যায় না। তাই এটাকে পেশা হিসেবে নয় নেশা হিসেবে নেয়াই সাংবাদিকের প্রধান কর্ম।

 একজন সাংবাদিকের মান-অভিমান থাকতে নেই, রাগ অনুরাগ থাকতে নেই, আত্ম অহংকার থাকতে নেই। একজন সাংবাদিককে হতে হয় অসম্ভব কৌশলী। কারণ সমাজে যারা লুটেরা, দূর্বৃত্ত, দখলদার , অত্যাচারী, নির্যাতনকারী শক্তিধর তাদের নিকট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। অবস্থা দৃষ্টি এমন একজন সাংবাদিককে প্রতিনিয়ত বাঘ সিংহের গুহায় প্রবেশ করে তাদের সম্পর্ককে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। সুতরাং বাঘ সিংহ থেকে জীবন বাঁচানোর কৌশল তাকে অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে। একটি সংবাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। সেই ধৈর্য সাংবাদিককে ধারণ করতে হয়।

 একজন চাঁদাবাজ, একজন মাস্তান ,একজন লুটেরা, একজন সন্ত্রাসী ,একজন রাষ্ট্রপতি, একজন মন্ত্রী ,একজন সংসদ সদস্য  সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি তাঁর ক্ষমতা পাঁচ বছর ,দশ বছর অধিক ১৫/২০ বছর হতে পারে। কিন্তু একজন কলম সৈনিকের ক্ষমতা আজীবন। ধীরে ধীরে একজন সাংবাদিক জীবন দশায় রূপান্তরিত হয় তথ্য ভান্ডারে। যে সাংবাদিক যত তথ্য ভান্ডারে সমৃদ্ধশালী সে সাংবাদিক তত শক্তিশালী হয়। কলম সৈনিকের শক্তি অপ্রতিরোধ্য। তার সাথে পেরে উঠতে গেলে তাকে হত্যা করাই একমাত্র উপায় কিন্তু হত্যা হলেও তার কর্ম তাকে বারবার উপরে নিয়ে আসে। সুতরাং কেউ যদি মনে করে একজন সাংবাদিকের উপর হামলা ,হেনস্তা ,হত্যা করে তার শক্তিকে নির্মূল করা সম্ভব সেটা চরম বোকামি ভিন্ন অন্য কিছু নয়। 

ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে সাংবাদিকদের কুক্ষিগত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের অনেকে সাংবাদিকদের অর্থ প্রদানের বিষয়টা সামনে নিয়ে আসেন। তাদের ধারণা সাংবাদিকদের কোন খাবারের প্রয়োজন হয় না। তারা বাতাস খেয়ে বাঁচে। সেবামূলক পেশা হিসেবে সাংবাদিকদের পাশাপাশি আইনজীবী এবং ডাক্তারদের তারা চোখে দেখেনা। সাংবাদিকতা করে প্রচুর অর্থবৃত্তির মালিক হয়েছেন এরকম উদাহরণ খুব কমই আছে কিন্তু আইন ব্যবসা এবং ডাক্তারি করে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন এই উদাহরণ রাষ্ট্র এবং সমাজে প্রচুর। আইনজীবী এবং ডাক্তারদের ফি থাকতে পারে কিন্তু সাংবাদিকের কোন ফি থাকতে পারে না। যারা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল করে বেড়ান তাদের বিশাল অংকের অর্থ দিয়ে নিয়ে যেয়ে ওয়াজ শোনেন, বিভিন্ন ধর্মযাজকদের তাদের ভক্তরা অর্থের বিনিময় নিয়ে যান এবং অর্থ প্রদান করেন। এমন কি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যদি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিদর্শনে যায় সেখানেও তার অর্থায়নের ব্যবস্থা আছে কিন্তু কোথাও সাংবাদিকের অর্থায়নের ব্যবস্থা নাই। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সাংবাদিকরা যা করেন সেটা তার নিজের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই করে থাকেন। 

পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া কর্পেট পুঁজির মালিকদের হাতে । মাঠ পর্যায়ে যে সমস্ত সাংবাদিক সাংবাদিকতা করেন তাদের দায়বদ্ধতা তারা গ্রহণ করেন না। হামলা মামলার তার কোন দায়বদ্ধতা তাদের নেই। কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের পরিবারের নেই কোন নিরাপত্তা। জীবনের প্রতি বাঁকে বাঁকে ঝুঁকির মাধ্যম দিয়েই সাংবাদিকের দিনোপাত করতে হয়। রাষ্ট্রের নেই কোন দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্র সাংবাদিকের প্রতিপক্ষ হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত। যার কারনে অনেক সাংবাদিক যারা বিদ্যাবুদ্ধিতে পারদর্শী হয়েও তারা ক্ষমতাসীন দলের দালালি করে থাকে। যেটা সাংবাদিকদের জন্য কলঙ্কিত অধ্যায়ের রচনা করছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা তাদের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য কর্পেট পুঁজির মালিক সম্পাদকদের অর্থ প্রদান করে থাকে। যাহাতে সাংবাদিকের অনেক লেখনি পত্রিকায় প্রকাশিত না হয়। অনেক সময় সাংবাদিকদের লেখনি স্তব্ধ করার জন্য অবাঞ্চিত আইন প্রণয়ন করা হয় যেটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনার নামান্তর ছাড়া কিছুই নয়। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিটা প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বলেই মনে করে। 

কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে সাংবাদিকদের খোলা কলমের লেখনি রাষ্ট্রকে সুশাসন, সু বিচার ব্যবস্থা ,নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। 

তবে হলুদ সাংবাদিকতা এটা যেমন পূর্বেও ছিল এখনো আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র তার ফ্যাসিবাদী চরিত্র পরিহার না করবে। রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে হবে প্রকৃত সাংবাদিকদের। রাষ্ট্র যতদিন পর্যন্ত দালাল সাংবাদিকদের মূল্যায়ন করবে ততদিন পর্যন্ত হলুদ সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য কমবে না বরং বাড়বে। যেমন হল ওয়েল কর্তৃক রচিত অন্ধকূপ হত্যা কল্পকাহিনী হলুদ সাংবাদিকতার একটি অন্যতম উদাহরণ মাত্র। মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া এবং চ্যানেল খোলা যে প্রক্রিয়া তাহা প্রকৃত সাংবাদিকতার অন্তরায়। সুতরাং সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের হাত থেকে কিভাবে সাংবাদিকতা প্রকৃত সাংবাদিকদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া যায়। সাংবাদিকতাকে আইনজীবী ডাক্তারদের পেশার মতো ব্যবসায়ী পেশায় পরিণত না করে সেবামূলক পেশার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন