সালথায় আষাঢ়ের বিলে অনুষ্ঠিত হলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ
ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি :
সালথায় আষাঢ়ের বিলে অনুষ্ঠিত হলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা।
নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মাঝিদের প্রাণবন্ত স্লোগান আর হাজারো দর্শকের উল্লাসে মুখর হয়ে উঠেছিল ফরিদপুরের সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের আষাঢ়ের বিল। আবহমান গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী এই নৌকাবাইচ।
একই সঙ্গে বসে গ্রামীণ মেলা। উৎসবমুখর পরিবেশে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষসহ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় আনন্দের মিলনমেলায়।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৪টায় উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের খোয়াড় গ্রামের বটতলা সংলগ্ন আষাঢ়ের বিলে এ নৌকাবাইচের আয়োজন করে খোয়াড় গ্রামবাসী।
বিকেল গড়াতেই বিলের দুই পাড়ে ভিড় জমাতে শুরু করেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
দূর-দূরান্ত থেকে নৌকাবাইচ প্রেমীরা ছুটে আসেন প্রিয় এই গ্রামীণ খেলা উপভোগ করতে। প্রতিযোগিতা শুরু হলে মাঝিদের বৈঠার তালে তালে এগিয়ে চলা নৌকা আর তাদের উদ্দীপনাময় স্লোগানে দর্শকদের মধ্যে সৃষ্টি হয় বাড়তি উত্তেজনা।
প্রতিটি নৌকার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের করতালি ও উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো আষাঢ়ের বিল।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে আয়োজিত গ্রামীণ মেলাও ছিল দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। মেলায় বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ পণ্য, মুখরোচক খাবার ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর সমাহার ঘটে। শিশুদের জন্য ছিল নানা বিনোদনের আয়োজন। ফলে নৌকাবাইচের পাশাপাশি গ্রামীণ মেলাতেও ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন সময়ে নৌকাবাইচের মতো আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন প্রজন্মও এ আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামবাংলার পুরোনো সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী দলগুলোর মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার, জেলা স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মো. জাহিদ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার খায়রুল বাসার আজাদ, সালথা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপি নেতা মো. শাহিনুর রহমান শাহিন, নাসির মাতুব্বর ও কামরুল ইসলাম, বিএনপি নেতা পাভেল রায়হান, কামরুল হাসান মজনু, ইব্রাহিম মেম্বার।
এ ছাড়া স্থানীয় আটঘর ইউনিয়ন ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মুরাদুর রহমান, উপজেলা যুবদল নেতা শাফিকুল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান খান, যুবদল নেতা আমিনুল ইসলাম বিশু, কালাম মাতুব্বর, শাহিন বেপারী, মো. জসিম মোল্যা, স্থানীয় সামাদ মাতুব্বর, আনিচুর রহমান মেম্বার, বিএনপি নেতা রাশেদ মৃধা, লোকমান ফকির, কাওসার মাতুব্বরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নৌকার বৈঠার ছন্দ আর মাঝিদের কণ্ঠের উদ্দীপনাময় স্লোগানে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় আবহমান গ্রামবাংলার চিরচেনা সেই বাইচের ঐতিহ্য।
উৎসবমুখর আয়োজনের আনন্দঘন মুহূর্তের কিছুটা চ্ছেদ হয় এক মায়ের সাথে মেলা দেখতে আসা একটি ছোট্ট শিশুর হারিয়ে যাওয়ায়। মায়ের বুক ভড়া আনন্দ বিষাদে পরিনত হয়; অবশেষে মেলা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালে তারা দ্রুত মাইকে প্রচার করার ফলে খোঁজ মেলে শিশুটির। হারিয়ে যাওয়া শিশুটি ফিরে আসে সায়ের বুকে; তখন মা-শিশুর মিলনে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: