• ঢাকা
  • বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. অপরাধ

৪ কোটি টাকার ৩১৮ প্রকল্পে লুটপাট: বাউফলে কাজ না করেই কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:২৯ পিএম;
৪ কোটি টাকার ৩১৮ প্রকল্পে লুটপাট: বাউফলে কাজ না করেই কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

লিটু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

 

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (টিআর/কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় নেওয়া ৩১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ৩ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৬০৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে বাস্তবায়নাধীন এসব প্রকল্পের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কাজ না করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে সমুদয় টাকা উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, এসব প্রকল্পের আওতায় মাটির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের মাঠ ভরাট, বিভিন্ন অবকাঠামো মেরামত এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ করার কথা ছিল।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রকল্প তালিকার সঙ্গে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩১৮টি প্রকল্পের অর্ধেকের বেশির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো কাজই হয়নি। নামমাত্র কিছু কাজ দেখিয়ে বা পুরোপুরি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ধুলিয়া ইউনিয়ন: ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুচরাকাঠি আব্দুল জব্বার মৃধা বাড়ির জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের জন্য ১ লাখ ৩১ হাজার ২৬৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, ঈদগাহ মাঠটি আগে থেকেই পাকা থাকা সত্ত্বেও সেখানে নতুন করে মাটি ভরাটের ভুয়া দেখিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। একই স্থানে ‘বায়তুস সালাহ জামে মসজিদ’ উন্নয়নের নামে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়ার তথ্য মিলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একই এলাকাকে কেন্দ্র করে ভিন্ন নামে দুটি প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের বড় অংশই আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বাউফল ইউনিয়ন: দক্ষিণ বিলবিলাস এলাকায় মন্নাত খানের বাড়ি থেকে পল্লী বিদ্যুতের পাকা সড়ক পর্যন্ত মাটির রাস্তা মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো মাটি ফেলা বা সংস্কারকাজ করা হয়নি। একইভাবে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আলিপুরা গ্রামের রুহুল আমিন হাওলাদারের বাড়ির পশ্চিম পাশ থেকে মির্জা বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণের কথা থাকলেও কোনো কাজ হয়নি, অথচ পুরো ২ লাখ টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সদর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গোসিংগা এলাকায় আফছেরের গেরেজ থেকে পশ্চিমে কোনো মাটির ব্যবস্থাপনাই নেই, অথচ সেখানে রাস্তা পুনর্নির্মাণের নামে ১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।

দাসপাড়া ইউনিয়ন: ৪নং ওয়ার্ডের ইসাহাক ফকির বাড়ি থেকে হোনা গাজী খালের পোল পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজটি করা হয়নি।

নাজিরপুর ইউনিয়ন: ৬নং ওয়ার্ডের সুলতানাবাদ গ্রামের জাকির চৌকিদারের বাড়ি থেকে বারেক চৌকিদারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের নামে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ তোলা হলেও কোনো কাজ করা হয়নি।

গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের টিআর/কাবিখার নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে পৌর শহরেও প্রকল্প গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। পৌর শহরের উপজেলা পরিষদের গেটসংলগ্ন ভবনের চতুর্থ তলায় ‘সাংবাদিক ক্লাব’ মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিন কোনো কাজ দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সাংবাদিক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্লাবের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বা সভাপতি কেউই কিছু জানেন না। এছাড়া উপজেলা পরিষদ চত্বরের আনসার ভিডিপি অফিসের পশ্চিম পাশে কোরআন প্রকল্প স্বতন্ত্র ইফতেদায়ি মাদ্রাসার সংস্কারের নামে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রামীণ অবকাঠামো তহবিলের অর্থ দিয়ে পৌর এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার কোনো বিধানই নেই।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্পের কাজের স্থানে বিস্তারিত তথ্যসংবলিত (প্রকল্পের নাম, বিবরণ, অর্থবছর, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ) সাইনবোর্ড টানানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি। ফলে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে।

বাউফল উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শরীফ তৌসিফুর রহমান রাফা জানান, তালিকায় থাকা অধিকাংশ প্রকল্পের নাম স্থানীয়রা কখনো শোনেননি। ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। উপজেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মোশারফ হোসেন খান লিটন বলেন, “অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এলাকায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।” দাসপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম চৌধুরীও একই অভিযোগ করে জানান, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হলেও শতাধিক কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। অথচ ওই টাকাগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কাছে রয়েছে এবং পরে তা ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বাউফল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, এসব প্রকল্প তার আগের মেয়াদের কর্মকর্তাদের সময়ে নেওয়া। তিনি যোগদানের পর যেসব প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন, সেখানে কোনো অনিয়ম পাননি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালেহ আহমেদ বলেন, “বিধি অনুযায়ী এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোনো প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন না হলে আমরা সেগুলো করিয়ে নেব অথবা সংশ্লিষ্ট সিপিসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন