২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ, নিউইয়র্কে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার আগে ধারাবাহিক বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, পার্শ্ব-অনুষ্ঠান ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য—সফরের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাচ্ছে এসব বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছান। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেন তিনি। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেন।
রোহিঙ্গা ও জলবায়ুতে গুরুত্ব
২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে থাকছে আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক। এরপর ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবেলা বিষয়ক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
একই দিন জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরবে।
দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ আয়োজিত পার্শ্ব-অনুষ্ঠান। সেখানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সংস্কারে আস্থার ওপর গুরুত্ব
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অধিবেশনের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, ‘এই অধিবেশনে আমাদের সামনে এমন একটি সুযোগ রয়েছে, যা দিয়ে আমরা দেখাতে পারি—যা কার্যকর হয়েছে, তা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি; যা কাজ করছে না, তা মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত; এবং আমরা এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তুলতে পারি, যা কেবল পরিবর্তনের সঙ্গে টিকে থাকতেই সক্ষম নয়, বরং পরিবর্তনকে সঠিক রূপ দিতে সক্ষম।’
তিনি বলেন, ‘সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে হলে আমাদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়ার মতো বাস্তববাদী, সংস্কারের জন্য যথেষ্ট সাহসী এবং সঠিক মানুষদের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। আমার মতে, এভাবেই আমরা আমাদের সংস্থার প্রতি আস্থা পুনর্বাসিত করতে পারি এবং এটিকে ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী করে তুলতে পারি।
’
খলিলুর রহমান বলেন, ‘কাজটি সহজ নয়, আর এটি রাতারাতি সম্ভবও নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ৮১ বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান আশা প্রকাশ করেছিলেন যে জাতিসংঘ নয় দশক ধরে টিকে থাকবে। আমরা আজ জাতিসংঘের নবম দশকের সূচনায় দাঁড়িয়ে আছি। আসুন, আমরা নিজেদের জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের কাজে উৎসর্গ করি, যাতে এটি আগামী বহু দশক ধরে তার অপরিসীম সম্ভাবনার স্বাক্ষর রেখে যেতে পারে।’
মূল নজর ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে
২৪ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ দিনটি কাটবে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবেলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন বাংলাদেশ আয়োজিত মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন তিনি। এতে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দক্ষ মিডওয়াইফারি সেবার গুরুত্ব তুলে ধরার কথা রয়েছে।
এরপরই থাকবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর জন্য ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রয়েছে, তবে সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
থাকছে ধারাবাহিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কর্মসূচিতে ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক রয়েছে। এ ছাড়া কুয়েতের যুবরাজের সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার প্রস্তুতি
সফরের শেষ দিনে ২৫ সেপ্টেম্বর জেপিমরগানের নিউইয়র্ক কার্যালয়ে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে কুয়েতের যুবরাজের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং প্রিন্স জায়েদ আল হুসেইনের সাথে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিএনপির নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে নিউইয়র্ক ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় এমিরেটসের EK202 ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
প্রবাসী বিএনপির স্বাগত ও উৎসাহ
সোমবার প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁর অবস্থানস্থল হোটেল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে জড়ো হন প্রবাসী বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। হাতে দলীয় পতাকা ও ব্যানার নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। তাঁকে একনজর দেখতে এবং শুভেচ্ছা জানাতে নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। হোটেলের সামনে অবস্থান নিয়েও তারা স্লোগান ও করতালির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: