মনোহরদীতে ওয়ারিশ জালিয়াতি ও নামজারি সিন্ডিকেট: তহশিলদার ঋতুর ফাইল টানে দালাল রাহাত!
বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক পুনরুত্থান | মনোহরদী (নরসিংদী)
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে একই পরিবারের সদস্যদের নামে ৩টি ভিন্ন ভিন্ন জাল ওয়ারিশ সনদ বানিয়ে কোটি টাকার জমি নামজারি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী জালিয়াতি চক্র ও ইউনিয়ন ভূমি দপ্তরের সুসংগঠিত আঁতাতের মাধ্যমে এই জালিয়াতি সম্পন্ন হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লেবুতলা ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) জিন্নাত হোসেন ঋতু দাপ্তরিক গোপন নামজারির নথি নিজে বা অনুমোদিত কর্মচারীর মাধ্যমে না পাঠিয়ে স্থানীয় এক কম্পিউটার দোকানদার ও চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে উপজেলা ভূমি অফিসে আনা-নেওয়া করাচ্ছেন।
৩টি জাল ওয়ারিশ সনদ ও জালিয়াতির চিত্র:
‘দৈনিক পুনরুত্থান’-এর অনুসন্ধানে ১ নং লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্ত ৩টি পৃথক ওয়ারিশ সনদের সত্যায়িত কপিতে মারাত্মক অসংগতি ধরা পড়ে:
১. প্রথম সনদ (স্মারক নং- লেবু. ইউপি. মনো. নর- ২৭৪/১২, তারিখ: ০৬/১১/২০২৫): ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ জাকির হোসেন আকন্দ ও সচিব স্বাক্ষরিত এই সনদে মূল ওয়ারিশদের নাম সম্পূর্ণ গোপন করে মাত্র ৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
২. দ্বিতীয় অনলাইন সনদ (সনদ নং- ৬৮০২৭৯৬৮৮৬৩, তারিখ: ২৫/০৪/২০২৫): মৃত মো: আ: জব্বার-এর নামে ইস্যুকৃত এই সনদে মূল পরিবারের অন্য ওয়ারিশদের নাম বাদ দিয়ে ৩ জনের নাম দেওয়া হয়।
৩. তৃতীয় অনলাইন সনদ (সনদ নং- ৯১৪৮৩১০৩৪৮০, তারিখ: ২৫/০৪/২০২৫): এতেও একইভাবে তথ্য গোপন করা হয়।
উক্ত জাল সনদের ওপর ভিত্তি করেই লেবুতলা মৌজার (জে.এল নং-৩) দাগ নং ২৬৯ (১১.০০ শতাংশ) ও ২৭০ (১০.৫০ শতাংশ) জমির বিপরীতে বিতর্কিত নামজারি খতিয়ান (নং ২০২৫-১০০০০১) প্রস্তুত করা হয়। ভুক্তভোগী শামসুল ইসলাম (পিতা: মৃত আঃ রাজ্জাক) নামজারি বাতিলের জন্য মনোহরদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয়ে ‘নামজারি ও জমাভাগ কেস নং-৩৬৬২/২৫-২৬’ দায়ের করলেও তা দীর্ঘ ৯ মাস ধরে রহস্যজনকভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এসিল্যান্ড অফিসে দালাল রাহাত হাতেনাতে আটক:
গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, আনুমানিক সকাল ১১:৩০ মিনিটে মনোহরদী উপজেলা ভূমি অফিসে অননুমোদিতভাবে সরকারি নামজারি ফাইল নিয়ে ঢোকার সময় ‘রাহাত মিয়া’ নামের এক যুবককে হাতেনাতে ধরে দৈনিক পুনরুত্থান-এর অনুসন্ধানী টিম। রাহাত স্থানীয় একটি কম্পিউটার দোকানে কাজ করে। সরকারি গোপনীয় নথি বহনের বিষয়ে জানতে চাইলে সে স্বীকার করে—"লেবুতলা ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) জিন্নাত হোসেন ঋতু তাকে এই নামজারির ফাইলগুলো দিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে পাঠিয়েছেন।"
উপজেলা ভূমি অফিসের কর্তব্যরত কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও নিশ্চিত করেন যে, রাহাত সরকারি কেউ নয়, তবে সে প্রায় সময়ই লেবুতলা ভূমি অফিসের ফাইল নিয়ে যাতায়াত করে।
অনুসন্ধানে প্রকাশ, তহশিলদার জিন্নাত হোসেন ঋতুর সাথে যোগসাজশে বহিরাগত দালাল রাহাত মিয়া আগত সেবা প্রার্থীদের কাছ থেকে নামজারি পাসের অজুহাতে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন করে থাকে।
ঘটনা ধামাচাপা দিতে দেনায়েত মার্কেটে শ্রমিক দল নেতার বৈঠক:
দালাল দিয়ে সরকারি নথি আনা-নেওয়া এবং ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর তা ধামাচাপা দিতে মাঠে নামেন রাহাত মিয়ার বোনের জামাই রুবেল মিয়া (পিতা: জালাল উদ্দিন, গ্রাম: নরেন্দ্রপুর)। রুবেল মিয়া লেবুতলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি।
রুবেল মিয়া প্রথমে দৈনিক পুনরুত্থান-এর রিপোর্টার এনামুল হক আল-আমিনের ফেসবুক মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন এবং পরবর্তীতে ফোন করে দেখা করার কথা বলেন।
গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে মনোহরদীর দেনায়েত মার্কেটে সাংবাদিক টিমের সাথে রাহাতকে নিয়ে বৈঠক করেন শ্রমিক দল নেতা রুবেল মিয়া। সাক্ষাৎকালে তিনি দালাল রাহাতকে "এতিম ও নিরীহ" দাবি করে বিষয়টি পত্রিকায় না ছাপানোর অনুরোধ জানান এবং আড়ালে নিয়ে রফা করার চেষ্টা চালান।
প্রশাসন ও এসিল্যান্ডের নীরবতা:
সরকারি গোপনীয়তা আইন (Official Secrets Act) লঙ্ঘন করে বহিরাগত দিয়ে ফাইল আদান-প্রদান, ২০ থেকে ১ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন এবং ৯ মাস ধরে ঝুলিয়ে রাখা নামজারি বাতিলের কেস (নং ৩৬৬২/২৫-২৬) বিষয়ে বক্তব্য জানতে মনোহরদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সজিব মিয়া-র সরকারি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। বার্তাটি হস্তান্তরিত ও দৃশ্যমান (Seen) হওয়া সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এসব জালিয়াতি, সরকারি নথিপত্র পাচার ও নেপথ্যের আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত প্রমাণ নিয়ে চোখ রাখুন দৈনিক পুনরুত্থান-এর আগামী পর্বে...
পত্রিকার ১ম পর্ব প্রকাশের চেক-লিস্ট:
১. ছবি: প্রধান ছবি হিসেবে ১৪ই সেপ্টেম্বর দালাল রাহাতের ফাইল হাতে ঢোকার ভিডিও স্ক্রিনশট এবং ৩টি জাল ওয়ারিশ সনদের কপি একসাথে কোলাজ করে দিন।
2. আইনি নোটিশ/অভিযোগ: এই ১ম পর্ব প্রকাশের সাথে সাথেই নরসিংদী জেলা প্রশাসক (DC) ও দুদক অফিসে রিপোর্টটির কপিসহ স্মারকলিপি জমা দিন।

দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: