• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেরুয়ারী ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২

Advertise your products here

  1. সোসাল মিডিয়া

রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নেওয়াটাই কি সাংবাদিক হায়দার আলীর অপরাধ?


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:২৮ পিএম;
রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নেওয়াটাই কি সাংবাদিক হায়দার আলীর অপরাধ?

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের একান্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে কালের কণ্ঠ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন। এতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন সময়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।

দুই পর্বে প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির ওই ‘সাহসী সাক্ষাৎকার’ দেশ ও দেশের বাইরে আলোচিত হয়েছে। দেশের বাইরের অনেক মিডিয়া কালের কণ্ঠের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার থেকে সংবাদ প্রকাশ করেছে। তবে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলীকে নিয়ে সমালোচনা শুরু করেছেন। রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক ‘গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ায়’ হায়দার আলীকে ট্যাগিং দিতে শুরু করেছেন। 

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকার নেওয়াটাই কি সাংবাদিক হায়দার আলীর অপরাধ? এমন প্রশ্ন তুলেছেন লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ। আজ বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন নাদিম। ট্যাগিংয়ের রাজনীতি বাদ দিয়ে পেশাদার সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা করতে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য নাদিম মাহমুদের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

২০২৪ সালে ৩১ মার্চ ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল ‘কালের কণ্ঠ’। 

সেই প্রতিবেদনের পর বেশ কিছু সিরিজ প্রতিবেদন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের নড়চড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। দেশজুড়ে আলোচনার শীর্ষে ছিল সেই খবরগুলো। একের পর এক বেনজীরের দুর্নীতির সেই সাহসী প্রতিবেদন করেছিলেন ‘হায়দার আলী’ ও তাঁর সহকর্মীরা।

 

এরও আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ায় অবৈধ শ্রমিক পাচার ও দুর্দশা নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদন, ‘চুক্তি করেও অরক্ষিত শ্রমিক’ কিংবা ‘অবৈধ শ্রমিক বানানোর কারখানা’ শিরোনামে প্রতিবেদনগুলোর কথা নিশ্চয় মনে আছে? 

kk

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নেন কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী

এটাও যদি মনে না থাকে, তাহলে স্মরণ করুন, বিসিএসআইআরের মালা খানের কথা। যিনি পিএইচডি জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বনে গিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছিল ‘জালিয়াতির মালা গেঁথেছেন মালা খান’।

সেই প্রতিবেদনের পর বেশ কিছু সিরিজ প্রতিবেদন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের নড়চড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। দেশজুড়ে আলোচনার শীর্ষে ছিল সেই খবরগুলো। একের পর এক বেনজীরের দুর্নীতির সেই সাহসী প্রতিবেদন করেছিলেন ‘হায়দার আলী’ ও তাঁর সহকর্মীরা।

 

এরও আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ায় অবৈধ শ্রমিক পাচার ও দুর্দশা নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদন, ‘চুক্তি করেও অরক্ষিত শ্রমিক’ কিংবা ‘অবৈধ শ্রমিক বানানোর কারখানা’ শিরোনামে প্রতিবেদনগুলোর কথা নিশ্চয় মনে আছে? 

kk

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারটি নেন কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী

এটাও যদি মনে না থাকে, তাহলে স্মরণ করুন, বিসিএসআইআরের মালা খানের কথা। যিনি পিএইচডি জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বনে গিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছিল ‘জালিয়াতির মালা গেঁথেছেন মালা খান’।

কিংবা গাজীপুরের বনের ৩০০ বিঘা জমি দখল করে ‘মুচি জসিমের শতকোটি টাকা’ শিরোনামে সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কথা অনেকের মনে থাকবার কথা। 
এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বাইরে সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতাপশালী এমপি পাপুলকে নিয়ে ‘শ্রমিক থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক এমপি পাপুল’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশজুড়ে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছিল। ‘এমপি বাহারের বাহারি রাজত্ব’ কিংবা ‘জিকে শামীম চলেন ছয় দেহরক্ষী নিয়ে' খবরগুলো তো এখনো আমাদের চোখে ভাসে।

 

অসংখ্য ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখে যে কালের কণ্ঠের ‘হায়দার আলী’ দেশের অনেক দুর্নীতিবাজ ও বনখেকো কিংবা দস্যুদের মুখোশ উম্মোচন গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে করে যাচ্ছেন, সেই মানুষটিকে নিয়ে গত কয়েক দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নোংরামি দেখে সত্যিই এক ধরনের অস্বস্তি আসছে।

প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠে দীর্ঘদিন পেশাদারির সঙ্গে সাংবাদিকতা করা হায়দার আলীকে আপনারা এখন ট্যাগ দিচ্ছেন ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে। কারণ এই হায়দার আলী সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির দুই পর্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এই কারণে। 

প্রশ্ন হলো, ওই সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক হিসেবে ঠিক কোন প্রশ্ন করায় তিনি কিংবা তার সহকর্মী পেশাদারিত্ব হারিয়েছেন দয়া করে বলবেন কি?
একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ প্রশ্ন করা, সেই প্রশ্নের উত্তর সাক্ষাৎ প্রদানকারী কী বলবেন, তা হুবহু তুলে দেওয়া। এটাই মৌলিক জার্নালিজম। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে, একজন সাংবাদিককে ‘টানাহেঁচড়া’ করা মূলত নোংরামি। আরো খোলাসা করে বললে বলতে হয়, ভণ্ডামি। আপনার পছন্দ হবে না, তখন আপনি গোষ্ঠী উদ্ধার করবেন, আপনার পছন্দ হবে তখন আপনি তাকে বুকে তুলে রাখবেন- এটাই তো আপনার হিপোক্রেসি নাকি?

বেনজীরের দুর্নীতির খবর নিয়ে যখন টানা সিরিজ করল, পাপুলের বিদেশের হাজার কোটি টাকা নিয়ে সংবাদ করল, গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীরের প্রার্থিতা নিয়ে হাসপাতালের নাটক করার এক্সক্লুসিভ সংবাদ তুলে আনল কিংবা একজন পিএইচডি জালিয়াত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কথা পত্রিকায় নিয়ে এলো, তখন তিনি ভালো ছিলেন। এখন রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ গ্রহণ করায় তিনি আওয়ামী লীগের দোসর হয়ে গেলেন?

আওয়ামী লীগের সময়ে এসব সংবাদ করার কারণে, যে মানুষটির বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছিল, প্রভাবশালী বেনজীররা যখন তাকে জামায়াত-বিএনপি বানিয়েছিল, তখন আপনাদের এই ‘ট্যাগিং’ কোথায় গিয়েছিল?

আপনাদের এই দ্বিচারিতার কারণে, এখন অনেক সাংবাদিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়েছেন। আপনাদের কটাক্ষের কারণে অনেক সাংবাদিক এই পেশাটাকেই ছেড়ে দিয়েছেন। 

সাংবাদিক হায়দার আলীকে নিয়ে এত বড় লেখার প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিককে নিয়ে যখন মিথ্যাচার ও নোংরামির পসরা বসে, তখন তার প্রতিবাদ করাটা দায়িত্বও বটে। হায়দার আলী সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরে তিনি একজন নাগরিক। তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ ও অপছন্দের বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু তার সেই পরিচয় যখন ‘সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব’ আঘাত হানে, তখন তা নিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু আমার জানা মতে, বাংলাদেশে যে কয়েকজন মানুষ মনে-প্রাণে সাংবাদিকতাটুকুকে ভালোবাসে, তাঁদের মধ্যে হায়দার আলী একজন। আমরা ব্যক্তি হায়দার আলীর চেয়ে সাংবাদিক হায়দার আলীকে সামনে রাখতে চাই। আমি অন্তত ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে তাকে চিনি ও জানি বিধায় এই কথাগুলো অকপটে লিখতে পারলাম। 

জেলা সাংবাদিক থেকে নির্বাহী সম্পাদক হওয়ার পরিশ্রমও দেখেছি। হায়দার আলীর সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন, তিনি সাংবাদিকতায় কোন জায়গায় অপেশাদারিত্ব দেখিয়েছে, সেটা নিয়ে কথা বলুন; কিন্তু ব্যক্তি হায়দার আলীকে ট্যাগিং দেওয়ার সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করুন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অগাধ ভালোবাসা কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়। বরং প্রশ্ন তুলুন, ওই সাংবাদিক শেখ হাসিনার শাসনামলে কয়টি প্লট বাগিয়েছে, কয়টি ব্যবসা বাগিয়েছে, কয়টি সুবিধা নিয়েছে। একজন পেশাদার সাংবাদিককে প্লিজ সাংবাদিকতাটুকু করতে দিন।

সূত্র: লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদের ফেসবুক পোস্ট থেকে

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন