• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২

Advertise your products here

  1. অপরাধ

“এমপি আবুল হোসেন খানের আত্মীয় বলে কথা: বাকেরগঞ্জে সরকারি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ”


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:০৭ পিএম;
“এমপি আবুল হোসেন খানের আত্মীয় বলে কথা: বাকেরগঞ্জে সরকারি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ”

নিজস্ব প্রতিবেদক :

 

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি সম্পদ লুটপাট ও পরিবেশ ধ্বংসের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব ও আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি জমিতে রোপণ করা মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে পুরো এলাকায়। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) উপজেলার পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ কানকি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি বড় আকারের আকাশমনি ও মেহগনি গাছ কোনো ধরনের সরকারি অনুমতি ছাড়াই কেটে ফেলা হয় বলে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, যা পরবর্তীতে প্রায় অর্ধলক্ষ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের আলোতেই ৩ থেকে ৪ জন সহযোগী নিয়ে প্রকাশ্যে এই গাছগুলো কাটা হয়, অথচ কেউ বাধা দিতে সাহস পায়নি, কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন খানের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এই ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে সোহাগ মোল্লার নাম, যিনি পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুম্মান মোল্লার বড় ভাই হিসেবে পরিচিত এবং স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে এলাকায় একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার পর সাংবাদিকরা তার কাছে বক্তব্য নিতে গেলে তিনি একাধিক পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা দেন—প্রথমে দাবি করেন, গাছগুলো তিনি নিজেই রোপণ করেছেন এবং এগুলো তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, এরপর বলেন বিদ্যুতের লাইনের সমস্যার কারণে গাছ কাটা হয়েছে, আবার কিছুক্ষণ পর স্বীকার করেন দোকান নির্মাণের জন্য সরকারি জমির গাছ কাটা হয়েছে, যা তার বক্তব্যের অসংগতি ও ঘটনাটির পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত বহন করে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বিষয়টি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের উৎকোচ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর আগে বাকেরগঞ্জ থেকে মির্জাগঞ্জ মহাসড়কের কানকি ব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা, সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্যে উপজেলা বন বিভাগের উদ্যোগে সরকারি অর্থায়নে এসব গাছ রোপণ করা হয়েছিল, ফলে এই গাছগুলো শুধুমাত্র কাঠের আর্থিক মূল্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একাধিক স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত লাভের আশায় এবং প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্যই এই গাছগুলো কেটে বিক্রি করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এমন ঘটনা বিভিন্ন স্থানে ঘটলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায় না। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ, হতাশা এবং ভীতির মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, কারণ তারা মনে করছেন রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অনেকেই আইনের ঊর্ধ্বে থেকে এমন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারে, যা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের জন্য একটি বড় হুমকি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নির্বিচারে গাছ কাটা হলে শুধু স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট হয় না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবও তীব্রতর হতে পারে, পাশাপাশি সড়কের পাশে বড় গাছ কেটে ফেলার ফলে যানবাহন চলাচলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। তারা মনে করেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে রোপণ করা গাছগুলো রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং সরকারি অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, সরকারি গাছ বিনা অনুমতিতে কাটার কোনো সুযোগ নেই এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, বাস্তবিক কঠোর পদক্ষেপ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। পুরো ঘটনাটি এখন শুধুমাত্র কয়েকটি গাছ কাটার অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবের একটি প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রের সম্পদ কি এভাবেই ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে থাকবে, নাকি প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে বাকেরগঞ্জবাসী।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন