বিমানে ৪ ‘ভুয়া’ পাইলট!
বিমানে চড়ে আকাশে উড়ছেন। হঠাৎ আপনি জানতে পারলেন, যে পাইলট বিমানটি চালাচ্ছেন, তাঁকে নিয়ে সমস্যা আছে। অন্তত তাঁর লাইসেন্স নিয়ে সমস্যা আছে; তিনি ভুয়া পাইলটও হতে পারেন। ভাবুন তো, আপনার মনের অবস্থা তখন কেমন হবে?
এই ভয়ানক পরিস্থিতি কিন্তু শুধু আর ভাবনার মধ্যে নেই।
বাস্তবেই এমন ঘটনার সন্ধান মিলেছে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে।
একজন-দুজন নয়, বিমানের সাতজন পাইলটকে নিয়ে যোগ্যতা-জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর বিমান কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত চারজন পাইলটের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের আলামত পায় ওই কমিটি।
কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ আনা হয়, ওই চার পাইলটের মধ্যে কেউ প্রয়োজনীয় উড়ানঘণ্টা পূরণ না করেই কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) পেয়েছেন; কেউ লগবুকে একই উড়ান সময় দুই কলামে দেখিয়ে ঘণ্টা বাড়িয়েছেন; আবার কারো ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে পরস্পর সাংঘর্ষিক উড়ান সনদ।
বিমানের সেই অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের নথিটি কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা করে বলা হয়েছে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাবমূর্তি নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেফটি কমপ্লায়েন্সও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এতে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও) কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির (ইএএসএ) মতো সংস্থার নজরদারি, এমনকি নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পাঁচ পৃষ্ঠার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে যে সাতজন পাইলটের নাম আসে, তাঁরা হলেন—ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ, ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ, ক্যাপ্টেন আনিস, ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাব, ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে নুরউদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে বিমানের কর্মী নন। মূলত চারজনকে ঘিরেই অভিযোগ গুরুতর। এই পাইলটদের লাইসেন্সের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাঁদের বিমান চালানো থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করা হলেও রহস্যময় কারণে তা মানা হয়নি। তার মানে, ৩৩ বছর আগে ‘ভুয়া’ লাইসেন্সধারী পাইলটরা হাজার হাজার যাত্রীর জানমাল নিয়ে এখন পর্যন্ত বিমান নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আকাশে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পাইলট রিক্রুটমেন্ট করার সময় বিমান কর্তৃপক্ষের অবশ্যই লাইসেন্স ও লগবুক দেখতে হয়। জটিলতা থাকলে সেটি পয়েন্ট আউট করে সিভিল এভিয়েশনকে প্রশ্ন করা উচিত—তাঁর উড়ান ঘণ্টা স্কোর ও লাইসেন্স কিভাবে হলো? এই চারজনের ক্ষেত্রে যদি যাচাই না হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই বিমান এটি এড়িয়ে গেছে।
কাঁপন ধরানো ই-মেইলে শুরু : ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার ই-মেইলে একটি বার্তা আসে। প্রেরক পরিচয়হীন, কিন্তু অভিযোগগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট, স্পর্শকাতর এবং বিস্ফোরক।
ই-মেইলে বলা হয়, কিছু ফ্লাইট অপারেশন্স ইন্সপেক্টরের বৈধ লাইসেন্স বা শারীরিক সক্ষমতা নেই। কেউ কেউ ফ্লাইং কারেন্সি বজায় না রেখেও পাইলট যাচাই ও অনুমোদনের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। ভুয়া, অসম্পূর্ণ বা অপর্যাপ্ত উড়ান ঘণ্টার ভিত্তিতে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এটিপিএল যোগ্যতার ক্ষেত্রে পি-১ ও পি-২ কলামে একই উড়ান সময় দ্বৈতভাবে দেখিয়ে উড়ানঘণ্টা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অমিল শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, আইসিএওর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী এমন অনিয়ম কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি ফ্লাইট সেফটির জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি। এ কারণেই ই-মেইলটি উপেক্ষা করা যায়নি। মূলত এই এক মেইলেই কেঁপে ওঠে বিমান কর্তৃপক্ষ।
কিভাবে এগিয়েছে অভিযোগ
আমাদের হাতে আসা নথি বলছে, গত ৯ জানুয়ারি রাত ৮টা ৫৪ মিনিটে ফ্লাইট সেফটি বিভাগে অভিযোগসংবলিত একটি ই-মেইল আসে। সেখানে প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্রও সংযুক্ত ছিল।
এরপর ১১ জানুয়ারি সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে বিষয়টি ফরোয়ার্ড করা হয় চিফ অব ফ্লাইট সেফটি এনামুল হক তালুকদারের কাছে। ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে অভিযোগটি পাঠানো হয় প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নওসাদ হোসেনের কাছে। জরুরি ভিত্তিতে জানতে চাওয়া হয়, এ ধরনের ঘটনা অতীতে ঘটেছিল কি না, আর ঘটলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ১৫ জানুয়ারি দুপুর ১টা ১৯ মিনিটে জবাবে জানানো হয়, তদন্ত শাখার রেকর্ড অনুযায়ী এ ধরনের ঘটনার পূর্বতথ্য পাওয়া যায়নি।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয় প্রথম বড় অসংগতি। কারণ আরেক নথিতে পরে উঠে আসে, ফার্স্ট অফিসার আল মেহেদী হাসান ইসলাম ও সাদিয়া আহমেদের শিক্ষাগত সনদ জাল থাকার ঘটনা এর আগেই প্রতিষ্ঠানের নজরে এসেছিল।
অবশেষে ২২ জানুয়ারি সকাল ১১টা ৩৬ মিনিটে নথিটি পাঠানো হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওর কাছে। সেখান থেকে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ আসে।
কমিটি গঠনেই এক মাস
অভিযোগের সূত্রপাত ৩০ ডিসেম্বর হলেও তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ২৮ জানুয়ারি। ওই দিন প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক মো. নওসাদ হোসেন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে (নম্বর ১৪/২০২৬) চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় মহাব্যবস্থাপককে (করপোরেট প্ল্যানিং)। সদস্য করা হয় ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি), উপব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস-সিস্টেম অডিট, ফেয়ার অ্যান্ড ফান্ড অডিট) এবং টেকনিক্যাল অ্যান্ড এফওডিসিসি বিভাগের উপব্যবস্থাপক (এওসি) সদস্যসচিবের দায়িত্ব পান।
কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়, অভিযুক্ত পাইলটদের কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) ইস্যু, রেটিং প্রদান, উড্ডয়ন ঘণ্টায় গরমিল, প্রশিক্ষণ ও অনুমোদন নথি এবং পুরো তদারকি কাঠামোয় কোনো অনিয়ম, জালিয়াতি বা বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধমূলক সুপারিশও দিতে বলা হয়। সময় দেওয়া হয় তিন কর্মদিবস।
প্রাথমিক তদন্তেই বিস্ফোরক তথ্য
তদন্ত শেষে ৩ ফেব্রুয়ারি পাঁচ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে ওই কমিটি। ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের জাল পাইলট লাইসেন্সের প্রাথমিক প্রতিবেদন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ওই চারজন সদস্যের স্বাক্ষর রয়েছে। আর সেই প্রতিবেদনেই একের পর এক উঠে এসেছে এমন সব অসংগতি, যা বিমানের ককপিটের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক তদারকির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাব : ২ সনদ, দুই বাস্তবতা
তদন্তে বেশি অসংগতি ধরা পড়েছে ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের ক্ষেত্রে। কমিটির ভাষায়, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগই সবচেয়ে বিস্তৃত ও দলিলসমৃদ্ধ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ১৯৯৩ সালে সিপিএল পান। কিন্তু তাঁর উড়ান প্রশিক্ষণ ও ফ্লাইং রেকর্ড ঘিরে এমন সব নথি পাওয়া গেছে, যেখানে একটির সঙ্গে অন্যটি মিলছে না।
১৯৯২ সালের ১৬ এপ্রিল ইস্যুকৃত সনদে দেখা যায়, সিপিএল নেওয়ার সময় তাঁর একক উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। এর মধ্যে তিন ঘণ্টা ৩০ মিনিট হেলিকপ্টারে উড্ডয়ন, বাকিটা তিনি দ্বিতীয় পাইলট হিসেবে উড়েছিলেন। এ বিষয়টি বিএএফ রেকর্ডে ডুয়াল আওয়ার্স হিসেবে দেখানো রয়েছে।
মাহতাবের নামে ১৯৯২ সালের ১০ জুন আরেকটি সনদ ইস্যু হয় একটি বিমান একাডেমির নামে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ১৫৫ ঘণ্টা পাইলট ইন কমান্ড (সলো) উড়ান সম্পন্ন করেছেন।
দুটি সনদ ইস্যুর ব্যবধান ৫৫ দিন। অথচ একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে কাছাকাছি সময়ের দুই সরকারি সনদে পৌনে ৩৪ ঘণ্টা আর ১৫৫ ঘণ্টা—এই বিপুল পার্থক্য বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, ক্যাপ্টেন মাহতাব বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজের প্রধান বৈমানিক, প্রশিক্ষক পাইলট এবং বিমানের একমাত্র বৈমানিক, যিনি একই সঙ্গে বোয়িং ৭৭৭ ও বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ চালানোর অনুমতিপ্রাপ্ত। তিনি গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫-২৬ সেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্ব হলো, দেশের বাণিজ্যিক পাইলটদের অধিকার, কল্যাণ ও পেশাগত উন্নয়ন রক্ষা করা এবং জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমানের উড্ডয়ন নিরাপত্তা মান বজায় রাখা। এতগুলো দায়িত্ব যাঁর কাঁধে, সেই ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধেই উঠল জালিয়াতির অভিযোগ।
অভিযোগের বিষয়ে ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের কাছে জানতে চাইলে প্রথমেই তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তারপর ক্যাপ্টেন মাহতাব বলেন, ‘বিমানে একটি সিন্ডিকেট আছে, যে কারণে আমি বিমান ও দেশের জন্য কথা বলতে গিয়ে তাদের কাছে অপরাধী হয়ে গেছি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বিমানকে বাপ-দাদার সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছে একটি গ্রুপ। তারা চায় বিমানে শুধু তাদের পরিবারের লোকজন আসুক; বাইরে থেকে কেউ না আসুক। সব সময় চেয়েছি লেভেল প্লেইন ফিল্ড হোক, বড় হোক এয়ার লাইনসটা। এ জন্যই আমি অপরাধী।’
ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান : ২৫০ ঘণ্টার জায়গায় ১৫৪:৩৫
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ আগেও বিমানের জানা ছিল। এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠিও পাঠায়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অভিযোগটি হলো, প্রয়োজনীয় ২৫০ ঘণ্টা উড়ান অভিজ্ঞতার পরিবর্তে তিনি মাত্র ১৫৪ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট লগ করেই লাইসেন্স পেয়েছেন। এটি নিছক কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং লাইসেন্স ইস্যুর প্রাথমিক শর্ত পূরণ না করেই সিপিএল পাওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম।
ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস : একই উড়ান সময় দুই কলামে
ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরো বেশি নাটকীয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তার লগবুকে একই উড়ান সময় পি-১ এবং পি-২, দুই কলামেই এন্ট্রি করা হয়েছে। সাধারণত এই দুই কলামের ব্যবহার আলাদা; ফলে একই সময় দুই জায়গায় দেখানো মানে ঘণ্টা হিসাবকে ফুলিয়ে দেখানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তদন্তকারীরা প্রতিবেদনে বলছেন, এটি সাধারণ ভুল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ফ্লাইং আওয়ার বাড়ানোর চেষ্টা, তা যাচাই করা জরুরি।
ক্যাপ্টেন আনিস : ২০০ ঘণ্টার আগে কিভাবে সিপিএল
ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রে তদন্তে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুতর অসংগতি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর লগবুক কপির ভিত্তিতে দেখা গেছে, তার উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। অথচ সে সময় সিপিএল পেতে প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ২০০ ঘণ্টা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি প্রয়োজনীয় ২০০ ঘণ্টা পূরণের আগেই সিপিএল পেয়েছেন? নাকি পরে সেই ঘণ্টা পূরণ করে লাইসেন্স ইস্যু বৈধ করা হয়েছে? তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানে চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি যে লগবুক জমা দিয়েছিলেন এবং সিএএবির রেকর্ড—দুটো মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার কথা। এই লাইসেন্স নিয়ম মেনে ইস্যু হয়েছিল, নাকি হয়নি, বিষয়টি অধিকতর তদন্তে উঠে আসতে পারে।
অভিযুক্ত পাইলটদের সরানোর সুপারিশ
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য আরো ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি প্রয়োজন। একইসঙ্গে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ ছাড়া অন্য অভিযুক্ত পাইলটদের সাময়িকভাবে ফ্লাইট দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করা যায় এবং বিমানের সম্ভাব্য আইনি ও বীমা ঝুঁকি এড়ানো যায়।
তদন্ত কমিটির মতে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এটি সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি, যাতে সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং দেশের বিমান চলাচল খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখা যায়।
তদন্তকালেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট
সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পাইলটের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত চলাকালে তাঁকে সব ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিরত তো রাখা হয়ইনি; বরং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে বিমান উড়িয়েছেন তাঁরা।
নথি অনুযায়ী, ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে জেদ্দাগামী ফ্লাইট (নম্বর বিজি৩৩৫) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন মাহতাব। একই দিন দুপুরে ঢাকা থেকে কাঠমাণ্ডুগামী ফ্লাইট (বিজি৩৭৩) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান। ২৬ ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুরগামী ফ্লাইট (বিজি৩৮৬) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন ইউসুফ। ওই দিন মাসকট থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইট (বিজি৭২২) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস।
অন্য তারিখের নথিতেও দেখা যায়, অভিযোগ ওঠার পরও তাঁদের কেউ লন্ডন, কেউ গুয়াংজু, কেউ সিঙ্গাপুর, কেউ কুয়ালালামপুর রুটে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটেও বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা করেন তদন্তাধীন অভিযুক্ত পাইলটরা।
প্রশ্ন নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতায়
তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলেছে, সিপিএল হলো একজন বাণিজ্যিক পাইলটের পেশাগত ভিত্তি। এই লাইসেন্স বৈধ না হলে পরবর্তী সব রেটিং, উন্নীতকরণ এমনকি উড়ান ক্যারিয়ারও প্রশ্নের মুখে পড়ে। অর্থাৎ এখানে কোনো একটি কাগজে ভুল টাইপ বা কোনো হিসাব-নিকাশের ছোটখাটো গরমিলের প্রশ্ন নয়, এটি একজন পাইলটের পেশাগত বৈধতার ভিত্তিমূল নিয়েই প্রশ্ন।
এই কারণেই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ঝুঁকির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইসিএও বা ইএএসএর মতো সংস্থাগুলো যদি মনে করে বাংলাদেশের লাইসেন্সিং ও তদারকি কাঠামোতে গুরুতর দুর্বলতা আছে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক রুট অনুমোদন, তদারকি অডিট, কোড-শেয়ার, ইনস্যুরেন্স রিস্ক এবং বিদেশি এয়ারপোর্ট অপারেশন—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অধিকতর তদন্তে নথি যাচাইয়ের আদেশ
এই প্রাথমিক প্রতিবেদনের পর আরো গভীর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তর থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট পাইলটদের লাইসেন্স ফাইল, লগবুক, প্রশিক্ষণ সনদ, পরীক্ষার ফলাফল ও অনুমোদন নথি যাচাই করে লাইসেন্সের বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. হুমায়রা সুলতানা এই আদেশে সই করেন।
সেই আদেশে ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ, ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ, আনিস ও বাসিত মাহতাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে উল্লেখ করা হয়।
আগেও ভুয়া সনদের লাইসেন্স বাতিল
২০২২ সালের ২০ জুন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে একটি চিঠি দেয় বেবিচক। সেখানে উল্লেখ করা হয়, আল মেহেদী ইসলাম নামক পাইলটের দাখিল করা সনদটির (ইস্যু নম্বর ২৬/০৯/এফআই/৭৭) অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি বেবিচকের কোনো রেকর্ডে। অথচ এই সনদ দেখিয়েই তিনি পাইলট লাইসেন্সের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। সেটিকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সনদ’ হিসেবে ঘোষণা দেয় বেবিচক।
এই তথ্য সামনে আসার পর বিমান কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। আল মেহেদী ইসলামের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করা হয়। উদ্যোগ নেওয়া হয় প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয়ের অর্থ আদায়ের।
আইনে শাস্তি কী?
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৭-এর ২৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আইন, বিধি, এএনও কিংবা লাইসেন্স/পারমিটের কোনো শর্ত লঙ্ঘন অপরাধ। এর শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
একই আইনের ২৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স, সনদ বা পারমিট জাল করলে বা জাল করার চেষ্টা করলে সেটিও অপরাধ—এ ক্ষেত্রেও শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
কথা বলতে নারাজ তদন্ত কমিটি
তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল দুপুর সোয়া ১টায় বলাকা ভবনে গেলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি। এরপর সন্ধ্যায় তদন্ত কমিটির সদস্য বিমানের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের উপপ্রধান ক্যাপ্টেন ইন্তেখাব হোসাইনকে ফোন করলে তিনিও এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারেন বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘পাইলটদের লাইসেন্স দিয়ে থাকে সিভিল এভিয়েশন। এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তাদের লাইসেন্সের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে বিমানের এমডি সিভিল এভিয়েশনে চিঠি দিয়েছেন। তবে এখনো কোনো উত্তর আসেনি।’
৩ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘ওই প্রতিবেদনে সব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। যাঁরা তদন্ত করেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। তাই এ বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।’
বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের তৎকালীন পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নওসাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে অভিযোগ পাওয়ার পর সেইফটি ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাদের প্রশাসনে পাঠাই। তখন এমডি ও সিইও মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে একটি প্রাথমিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং হিসেবে কমিটি করা হয়েছিল এবং গুরুত্ব বিবেচনা করে তিন দিন সময় দিই। তখন তারা একটা প্রতিবেদন তৈরি করে। এই কমিটি চূড়ান্তভাবে কাউকে দায়ী করেনি। কমিটি বলেছিল, তারা কিছু জিনিস পেয়েছে। আরো সময় চেয়েছিল তারা। পরে আরো সময় দেওয়া হয় এবং চূড়ান্তভাবে সিভিল এভিয়েশনে পত্র বিমান থেকে লেখা হয়। এমডি মহোদয় মনে করেছেন যে, তাঁদের গ্রাউন্ডেট রাখার দরকার নেই, তাই সেটা করা হয়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. হুমায়রা সুলতানাকে গতরাতে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই সার্বিক বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
দৈনিক পুনরুত্থান /
- বিষয়:
- বিমানে৪* ‘ভুয়া’,পাইলট!
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: