মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পাস: শিক্ষক হতে চাওয়ার অদম্য রিয়াদের গল্প
মো. নাফিউর রহমান, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে কখনো ইচ্ছা শক্তির কাছে হার মানে না, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নওগাঁর নিয়ামতপুরের রিয়াদ হাসান। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় দুই হাত হারালেও পড়াশোনার আলো নিভে যেতে দেননি তিনি। শরীরের পঙ্গুত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুখ দিয়ে লিখে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ২.৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় মসজিদের ছাদে খেলতে গিয়ে হঠাৎ বিদ্যুতায়িত হন রিয়াদ। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও তার দুটি হাত বাঁচাতে পারেননি, কেটে ফেলতে হয় দুটোই। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক আর হতাশা। তবে অভাব-অনটন আর শত প্রতিকূলতার মাঝেও রিয়াদের পড়াশোনার তীব্র স্পৃহা দেখে হাল ছাড়েননি তার দরিদ্র বাবা-মা। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে দাখিল পাস করলেন রিয়াদ। মুখে কলম গুঁজে দীর্ঘ পরীক্ষা দিয়ে এই সফলতা অর্জন করেছেন তিনি।
অভাবের তাড়নায় সংসারের দৈনন্দিন অনেক কাজেই তাকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। রিয়াদের ছোট ভাই ফরহাদ হোসেন পরম যত্নে ভাইকে খাইয়ে দেন। কিন্তু পড়ালেখার বেলায় রিয়াদ সম্পূর্ণ একাগ্র।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে রিয়াদ হাসান বলেন, ‘দুই হাত হারিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও আজ মুখ দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় পাস করেছি। ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হব। দাখিল পাস করায় আমি খুব আনন্দিত। আমার লেখাপড়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার মা-বাবার। পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব ও শিক্ষকেরাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করতে চাই।’
পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় উল্লেখ করে রিয়াদ আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে। আমার স্বপ্ন যাতে অর্থাভাবে ভেঙে না যায়, সেজন্য সরকারের একটু দৃষ্টি কামনা করছি।’
রিয়াদের মা দেলরুবা বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘ছেলের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে তার বাবা দিনমজুরের কাজ করে তাকে পড়িয়ে যাচ্ছেন। তার এই ফলাফলে আমরা ভীষণ আনন্দিত। অনেক কষ্ট করে হলেও ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, পড়াশোনা শেষ করে রিয়াদের একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা যেন করা হয়।’
রিয়াদের চাচা সিরাজুল ইসলাম জানান, দিনমজুর ভাইয়ের পক্ষে এতিম এই সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালানো অত্যন্ত কষ্টকর। ভাতিজার স্বপ্ন একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া। অর্থের অভাবে যাতে তার এই স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে না যায়, সেজন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
নিয়ামতপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত আছি। রিয়াদের জন্য শুভকামনা রইল। তার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষা অফিস থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুর্শিদা খাতুন জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে তিনি অবগত হয়েছেন। রিয়াদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: