অবশেষে ফরিদপুরের ময়েনদিয়া-খাড়দিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের অবসান হলো
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
ফরিদপুরের সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী খাড়দিয়া-ময়েনদিয়ার মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান হলো।
সোমবার (৩১ আগষ্ট ২০২৬) রাতে ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক বিশেষ বৈঠকের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিবদমান দুই গ্রুপের মধ্যে একটি সমঝোতা তৈরি হয়। উভয় গ্রুপ শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে একে অপরকে বুকে টেনে নেন।
ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপারের কঠোর নির্দেশনায় বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম রকিবুল হাসান, সালথা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদর উদ্দিনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং সালথা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: বাবলুর রহমান খাঁন (ওসি) ও বোয়ালমারীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মোস্তাফিজুর রমানের সার্বিক সহযোগিতায় সালথা ও বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে একান্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুই পক্ষের মিলন ঘটে। তাঁদের এই আলিঙ্গন দৃশ্য প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে এলকায় শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এলাকাবাসীর একান্ত কামনা বজায় থাকুক এই সৌহার্দের স্মৃতি, চিরদিন অমলিন হয়ে থাকুক উভয়ের ভালোবাসা। গড়ে উঠুক পরস্পরের মধ্যে গভীর আন্তরিকতা।
দীর্ঘদিনের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসানের সূচনালগ্নে নিজ নিজ এলাকার শান্তি বজায় রাখতে উভয় নেতাই অঙ্গীকারাবদ্ধ হন। গত দুইদিন যাবৎ উভয় পক্ষের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আর চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে যা বলা হয়েছিল তা সকলের জ্ঞাতার্থে পুন:রায় দেওয়া হলো :
বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, বোয়ালমারীতে আহত ৩০
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে একটি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের ৭ ঘণ্টার সংঘর্ষে আহত হন ৩০ জন। গত রোববার বিকেলে শুরু হওয়া সংঘর্ষ চলে রাত ১১টা পর্যন্ত। এ ঘটনার জেরে সোমবারও অন্তত ১০-১২টি বাড়িঘরে ভাঙচুর করা হয়েছে। এ দিকে শিশু-কিশোরদের ফুটবল খেলার দ্বন্দ্বে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে রোববার রাতে ছয়টি মহল্লার বাসিন্দাদের সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। তারা টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন বলে জানা গেছে।
বাজারে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব
বোয়ালমারীর পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজারটি সালথা উপজেলার কাছাকাছি অবস্থিত। বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পরমেশ্বরদী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান (বরখাস্ত) আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের সঙ্গে সালথার খারদিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের বিরোধ রয়েছে। জিহাদ মানবতাবিরোধী মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবুল কালাম আজাদের ছেলে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) থেকে বিএনপিতে যোগ দেন আব্দুল মান্নান মাতুব্বর।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের পুরোনো বিরোধ মাথাচাড়া দেয়। অভ্যুত্থানের পর মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তাঁর ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে। এরপর মান্নান মাতুব্বরসহ তাঁর পক্ষের লোকজন এলাকা ছেড়ে যান। তখন ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে জিহাদের লোকজনের কাছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তাঁর পক্ষের লোকজন এলাকায় ফেরেন। তখন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আবারও ফের উত্তেজনা দেখা দেয়। গত শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে জিহাদের কিছু সমর্থক হামলা করেন বলে অভিযোগ। এর জেরে গত শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে জিহাদের পক্ষের যুবদল নেতা সোলায়মান মাতুব্বরের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের তর্কাতর্কি হয়। তখন এক ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ীর কাছে চার হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। এ দিন হাতাহাতি হলে সোলায়মান আহত হন। খবর পেয়ে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ সোলায়মানকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা করান। জিহাদের অভিযোগ, মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার নেতৃত্বে সেখানে তাঁর ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে তিনি আহত হন।
জিহাদের অনুসারী যুবদল নেতা মাহবুব হাসান সজিব বলেন, দীর্ঘদিন মান্নান মাতুব্বর বাজারে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাঁর প্রভাবমুক্ত করতে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদকে বাজার কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছিল। শনিবার মান্নান মাতুব্বরের লোকজনের হামলায় জিহাদ ও সোলায়মান আহত হন।
ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মোল্যার অভিযোগ, জিহাদ লোকজন নিয়ে এসে হামলা চালান। তারা সাধারণ দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দার কাছে চাঁদা দাবি করেন। না দিলে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী মাওলানা মাসুদুর রহমানও কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য কল দিয়ে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তারা মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ দিকে হামলার আশঙ্কায় গত রোববার সকাল থেকে ময়েনদিয়ার লোকজন প্রস্তুতি নেয়। খারদিয়া লোকজন বিকেল ৪টার দিকে সশস্ত্র অবস্থায় এগিয়ে এলে ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুপক্ষের সংঘর্ষ শুরু হয়। রাত ১১টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে।
এতে আহত ৩০ জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত পরমেশ্বরদী গ্রামের কবির মোল্যা, কামরুল মোল্যা ও লোকমান মোল্যাকে ফরিদপুরে চিকিৎসাধীন বলে জানান বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ইজাজ আহমেদ শাওন।
এ ঘটনার জেরে সোমবার ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকা ও উজিরপুরের আশপাশে আবারও সংঘর্ষ হয়। এ সময় মান্নান মাতুব্বরের ১০-১২ জন সমর্থকের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। তবে এ দিন হতাহতের তথ্য মেলেনি।
খবর পেয়ে বোয়ালমারীর ইউএনও এস এম রকিবুল হাসান, সালথার ইউএনও দবির উদ্দিন ও দুই থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। বোয়ালমারী থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। কোনো পক্ষই লিখিত অভিযোগ দেয়নি।
ইউএনও এস এম রকিবুল হাসান বলেন, বিষয়টি নিয়ে তারা ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গেছেন। সেখানে ঝামেলা আছে, তারা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করছেন।
সর্বশেষ সংবাদে জানা যায়, তাঁদের মিশন সাকসেস হয়েছে! উভয় গ্রুপ একে অপরের সাঁথে কোলাকুলি এবং হাত ধরাধরি করে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছেন। এলাকায় এ সংবাদ প্রকাশের সাথে এলাকায় শান্তির সুবতাস বইতে শুরু করেছে। এলাকার মানুষের জনমনে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: