• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও হয়নি হাসপাতাল, সেবাবঞ্চিত রাঙ্গাবালীর ২ লাখ মানুষ


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৯:০৫ পিএম;
স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও হয়নি হাসপাতাল, সেবাবঞ্চিত রাঙ্গাবালীর ২ লাখ মানুষ

লিটু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

 

পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীতে স্বাধীনতার ৫৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। ফলে যুগের পর যুগ আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে এই এলাকার প্রায় দুই লাখ মানুষ। দেশজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে নানা উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও, এই জনপদের বাসিন্দাদের জীবন কাটছে এক চরম নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে।

দেশের ৫০২টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র রাঙ্গাবালী উপজেলায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল নেই। জেলা সদর পটুয়াখালী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এ দ্বীপ উপজেলায় কোনো মানুষ অসুস্থ হলে শুরু হয় নদী পাড়ি দিয়ে জীবন বাঁচানোর অন্তহীন সংগ্রাম। প্রসব ব্যথা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্য যেকোনো গুরুতর অসুস্থতায় রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে নদীপথে গলাচিপা অথবা পটুয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে ছুটতে হয়। চারদিকে নদীবেষ্টিত ৩৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় বৈরী আবহাওয়ায় চলাচলের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় তীব্র নৌযান সংকট। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন অন্তঃসত্ত্বা নারী, নবজাতক শিশু ও বয়স্ক রোগীরা।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ লাঘবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে উপজেলার পাঁচ একর জমির ওপর চারতলা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু করে ‘মেসার্স একেএপিসিএমএই জয়েন্ট ভেঞ্চার’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পৃথক দুটি লটে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও, এক বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রথম লটের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় লটের প্রায় ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরই থমকে যায়। ২০২৪ সালের জুন মাসে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ দুই বছর কেটে গেলেও হাসপাতালটি চালুর মুখ দেখেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন হাসপাতাল ভবনটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। যে ভবনে একদিন দ্বীপবাসীর আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন অবাধে গরু-ছাগল চরছে। ভবনের দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা এবং চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর ভবনটিকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। চিকিৎসাসেবার আশার প্রতীক হয়ে ওঠার কথা থাকলেও ভবনটি বর্তমানে চরম অবহেলার এক নীরব সাক্ষীতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে গ্রাম্য চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে হয়। অবস্থার অবনতি হলে বাধ্য হয়ে নদীপথে অন্য উপজেলায় নিতে হয়। কিন্তু রাত হলে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ, খেয়া বা স্পিডবোট—কোনোটিরই দেখা মেলে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটেই অপেক্ষা করতে হয়, যা অনেক সময় রোগীর জন্য মৃত্যুঝুঁকি ডেকে আনে। কাদা-মাটির পথ পেরিয়ে বিশাল নদী পাড়ি দেওয়ার সময় অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মাঝনদীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে তারা অভিযোগ করেন। তারা দ্রুত রাঙ্গাবালী ৫০ শয্যা হাসপাতালের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তা চালুর জোর দাবি জানান।

রাঙ্গাবালীর উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা. ফিরোজ মাহমুদ বলেন, “আমাদের এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল না থাকায় সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু হৃদরোগী, গর্ভবর্তী মা কিংবা অন্যান্য সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। দ্রুত তাদের অন্য উপজেলায় পাঠাতে হয়। নদী উত্তাল থাকলে স্পিডবোট বা ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকে, তখন রোগী ও স্বজনদের জীবন বাজি রেখে অপেক্ষা করতে হয়। রাঙ্গাবালীর মানুষের সুরক্ষায় এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “হাসপাতালের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করতে পৃথক দুটি লটে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ শুরু হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।”

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “২০২৪ সালে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছিল। তবে প্রকল্পটির ডিপিপি নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। আশা করা হচ্ছে, এরপরই দ্রুত হাসপাতালের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে।”

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন