অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দখলে বোয়ালমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের দখলে বোয়ালমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ড্রেনগুলো যেন মশা সৃষ্টির কারখানা
বিশেষ প্রতিনিধি, বোয়ালমারী (ফরিদপুর):
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা ও জ্বালানি সংকটের অজুহাতে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জিম্মি হয়ে পড়েছে এক শক্তিশালী বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হাতে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে জিম্মি করে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে চড়া ভাড়া। হাসপাতালের প্রধান চত্বর এখন তাদের দখলে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সের নৈরাজ্যই নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনা ও ডাবের খোলায় উপচে পড়ে রূপ নিয়েছে মশা উৎপাদনের কারখানায়!
জরুরি সেবার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি চালকদের হাতে।
১০০ শয্যার এই হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ভবনের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ৮ থেকে ১০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। অথচ হাসপাতালের নিজস্ব সরকারি অ্যাম্বুলেন্স এবং উপজেলা পরিষদের জাইকা (JICA) প্রকল্পের অর্থায়নে পাওয়া আরেকটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের দেখা মেলেনি চত্বরে; খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দুটিই গ্যারেজে তালাবদ্ধ।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের দুই চালক হাসপাতালের নবনির্মিত অক্সিজেন প্লান্ট ভবনটি দখল করে বেসরকারি সিন্ডিকেটের কার্যালয় বানিয়ে নিয়েছেন। রোগীদের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন ভবনটি এখন অ্যাম্বুলেন্স চালক ও তাঁদের সহযোগীদের বসার আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতাল এলাকায় নিয়মিত ১০-১২টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করলেও বিআরটিএ (BRTA)-এর অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪টির। বাকি গাড়িগুলোর নিবন্ধন, ফিটনেস কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বৈধ কি না! তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, জাইকা প্রকল্পের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটির চালক মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর ‘স্বার্থের সংঘাত’-এর অভিযোগ। তিনি নিজে একটি ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্সের মালিক এবং সেটি চালান তাঁর ছেলে। সরকারি চালক নিজেই বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় সরকারি গাড়ি না চালিয়ে রোগীদের নিজেদের গাড়িতে উঠতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে এসেছে।
ভাড়ার নৈরাজ্য ও ‘বকশিস’ বাণিজ্যের অভিযোগ তো আছেই।
বোয়ালমারী থেকে ফরিদপুর (৩৮ কিমি) আসা-যাওয়ায় নির্ধারিত ভাড়া ৮০০ টাকা (কিলোমিটারপ্রতি ১০ টাকা)। তবে চালক শহিদুল ইসলাম আদায় করেন ১,০০০ টাকা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চালকের সাফ জবাব, "এটা অতিরিক্ত ভাড়া নয়, রোগীরা পান-সিগারেট খাওয়ার জন্য ২০০ টাকা বকশিস দেন।"
জাইকা অ্যাম্বুলেন্স: এসি ও অক্সিজেন সরবরাহসহ নির্ধারিত ভাড়া ১,৮০০ টাকা (এসি/অক্সিজেন ছাড়া ১,২০০-১,৫০০ টাকা)।
বেসরকারি সিন্ডিকেট: একই গন্তব্যের জন্য বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ট্রিপপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১,৬০০ থেকে ২,০০০ টাকা! আকস্মিক বিপদের মুহূর্তে দর-কষাকষির সুযোগ না থাকায় স্বজনেরা চড়া দাম মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল প্রতি রোগী থেকে ২০০ টাকা কমিশন নিয়ে স্বজনদের নির্দিষ্ট বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে যেতে প্রভাবিত করে।
অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর মাদকের অভিযোগ। কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবনে দুই চালককে ইয়াবা সেবন করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীরা এখনো বহাল তবিয়তে চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং জায়গাটিকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত করেছেন।
ড্রেনগুলো মশা সৃষ্টির কারখানা, গন্ধে অচল ওয়ার্ড
চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ড্রেনগুলো ময়লা, পলিথিন ও ডাবের খোলায় ভরাট হয়ে পানি জমে আছে। দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এসব জমে থাকা পানিতে জন্ম নিচ্ছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। অন্যদিকে পরিচ্ছন্নতার অভাবে রোগীদের ওয়ার্ডে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা সুস্থ মানুষের পক্ষেও সহ্য করা কঠিন।
বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, "বর্তমান জ্বালানি বরাদ্দে দিনে সর্বোচ্চ দুইবার ফরিদপুরে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো সম্ভব। অথচ প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন মুমূর্ষু রোগীকে স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়। লোকবল সংকটের কারণে পরিচ্ছন্নতার কাজও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিং এবং ভাড়ার তালিকা টাঙানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।"
সরকারি হাসপাতালের জরুরি সেবা কেন একটি বেসরকারি সিন্ডিকেটের দখলে থাকবে—সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে হাসপাতাল চত্বর থেকে অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স সরানো, গাড়ির ফিটনেস ও কাগজপত্র যাচাই করা, কমিশন বাণিজ্য ও মাদকের আড্ডা বন্ধ করা এবং ড্রেন পরিষ্কার করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: