ইতিহাসের সেরা ঈদ’ না কি নিরাপত্তাহীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি: সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ প্রাণহানির দায় কা
নজরুল ইসলাম আলীম:
প্রতিবছর ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে—পরিবারের কাছে ফেরার উচ্ছ্বাস, প্রিয়জনদের সাথে মিলনের প্রত্যাশা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সুখের কিছু মুহূর্ত। কিন্তু এবারের ঈদ সেই চিরচেনা আনন্দকে ছাপিয়ে রয়ে গেছে এক গভীর বেদনা, উদ্বেগ এবং প্রশ্নবোধক চিহ্নের ভার নিয়ে। ১৭ই মার্চ থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন মানুষের প্রাণহানি—এ পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি ২৭৪টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, ২৭৪টি জীবনের অপূর্ণ অধ্যায়।সরকারের পক্ষ থেকে এবারের ঈদকে “ইতিহাসের সেরা ঈদ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কি সেই দাবিকে সমর্থন করে? যখন আমরা দেখি মানুষ লঞ্চে উঠতে গিয়ে পিষ্ট হচ্ছে, একটি ধর্মীয় পরিবারের প্রধান তার পুরো পরিবারসহ প্রাণ হারাচ্ছেন, একই পরিবারের একাধিক সদস্য একসাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন—তখন এই ‘সেরা’ শব্দটি কানে বাজে এক নির্মম ব্যঙ্গ হিসেবে।
পরিবহন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতি বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—কেন এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায় না? সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি দায়িত্বহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ংকর চক্র তৈরি হয়েছে, যার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।ঈদের সময় মানুষের চাপ বাড়বে—এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই পূর্বানুমানযোগ্য চাপ মোকাবেলায় পরিকল্পনার ঘাটতি কেন থাকবে? কেন সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না? কেন নৌ ও রেলপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় না? কেন একই ভুল বারবার ঘটার পরও জবাবদিহিতার কোনো দৃশ্যমান উদাহরণ দেখা যায় না?একই ঈদে ট্রেনের সাথে বাসের সংঘর্ষ, বাস নদীতে পড়ে যাওয়া, লঞ্চে উঠতে গিয়ে মানুষের চাপায় পিষ্ট হওয়া—এসব ঘটনা আলাদা আলাদা দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলো একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার বহুমাত্রিক প্রতিফলন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এত প্রাণহানির পরও যখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার উন্নয়ন সূচকে নয়, বরং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। যদি মানুষ ঘরে ফেরার পথে নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা অর্থবহ—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপ। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যানবাহনের ফিটনেস যাচাই এবং সর্বোপরি একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা—এসব আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।
ঈদ আনন্দের হোক, আতঙ্কের নয়—এটি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। “ইতিহাসের সেরা ঈদ” হতে হলে প্রথম শর্তই হওয়া উচিত—মানুষ যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে।
নচেৎ এই ‘সেরা’ শব্দটি ইতিহাসে জায়গা করে নেবে এক বেদনাদায়ক বিদ্রূপ হিসেবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
- বিষয়:
- ইতিহাসের* সেরা,ঈদ
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: