• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

চোখের সামনেই বিলীন হচ্ছে ভবানীর জন্মভিটা, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি শুধুই কাগজে-কলমে


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৮:৫৮ পিএম;
চোখের সামনেই বিলীন হচ্ছে ভবানীর জন্মভিটা, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি শুধুই কাগজে-কলমে

নাটোরের প্রখ্যাত রানি ভবানীর স্মৃতিবিজড়িত বগুড়ার আদমদীঘির ছাতিয়ান গ্রাম আজ চরম অবহেলা আর অযত্নে ধ্বংসের মুখে। মহীয়সী এই নারীর জন্মভিটা ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে স্থানটি ঝোপ-জঙ্গলে ঢেকে গেছে, আর অন্যদিকে গ্রাস করে নিচ্ছে দখলদারেরা। অথচ ঐতিহাসিক এই স্থানটি রক্ষায় স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও এখনো মেলেনি কোনো কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।

ছাতিয়ান গ্রামের হাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে রানি ভবানীর বাবার বাড়ির কিছু ভাঙা দেওয়াল ও ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে। তবে এগুলো এখন পুরোপুরি অরক্ষিত। সময়ের বিবর্তনে পুরোনো ভবনের অংশবিশেষ ভেঙে পড়ছে, আর পুরো চত্বর ঢেকে গেছে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা রানি ভবানীর জন্মস্থান দেখতে এসে প্রতিনিয়ত হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এলাকার বাসিন্দা ও বগুড়ার এক সরকারি চাকরিজীবী আজিমুদ্দিন এলাহী আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলেবেলা থেকেই রানি ভবানীর রাজবাড়ি ও মন্দির এমন ঝোপ-জঙ্গলে পড়ে থাকতে দেখছি। মায়ের স্মৃতি রক্ষায় নির্মিত জয়দুর্গা মন্দির ও শিবমন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়েছে। অথচ এসব রক্ষায় কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।” সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকে আসা শিক্ষক প্রাণ গোপাল দাস বিপ্লবও পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে এখানে এসে এর জরাজীর্ণ রূপ দেখে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, ছাতিয়ান গ্রামের জমিদার ছিলেন আত্মারাম চৌধুরী ও তার স্ত্রী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী। তারা নিঃসন্তান থাকায় সন্তান লাভের আশায় বাড়ির কাছের একটি নির্জন পুকুরপাড়ে সাধনা শুরু করেন, যা বর্তমানে ‘সিদ্ধেশ্বরী’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে তাদের ঘরে জন্ম নেয় কন্যাসন্তান ভবানী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও জনদরদি।

ভবানীর বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন নাটোর রাজবাড়ির দেওয়ান দয়ারাম ছাতিয়ানগ্রামে এসে ভোরে এক মেয়েকে পূজার জন্য ফুল তুলতে দেখেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তিনি আত্মারাম চৌধুরীরই একমাত্র কন্যা। পরবর্তীতে নাটোরের রাজকুমার রামকান্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বিয়েতে ভবানী কয়েকটি শর্ত দিয়েছিলেন—যার মধ্যে ছাতিয়ানগ্রামে ৩৬৫টি পুকুর খনন, ছাতিয়ানগ্রাম থেকে নাটোর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ এবং প্রজাদের পুনর্বাসন অন্যতম। পানির সংকট দূর করতে সে সময় খনন করা ওই পুকুরগুলোর কিছু চিহ্ন এখনো রয়েছে। এছাড়া ছাতিয়ানগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বদিকে ‘ভবানীর জাঙ্গাল’ নামের রাস্তার স্মৃতিও এখনও প্রচলিত।

১৭৪৮ সালে স্বামী রাজকুমার রামকান্তের মৃত্যুর পর রানি ভবানী নাটোরের জমিদারির দায়িত্ব নেন। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, অসংখ্য পুকুর ও হাট-বাজার স্থাপন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে তিনি প্রজাবৎসল ‘মহারানি’ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

স্থানীয় সমাজসেবক আলী রাজ হোসেন মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে জমিদার বাড়িটি সংস্কার ও চারপাশ ঘিরে একটি প্রাচীর নির্মাণ করা হলে এটি দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং এলাকার পরিবেশ বদলে যাবে।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আদমদীঘি উপজেলা পরিষদে এক গণশুনানিতে বিষয়টি জোরালোভাবে ওঠে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম উপস্থিত থেকে রানি ভবানীর সম্পত্তির হিসাব বের করে স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু এরপর সেই উদ্যোগ আর আলোর মুখ দেখেনি।

ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিউদ্দীন তালুকদার বলেন, সরকারি উদ্যোগে দ্রুত এটি সংরক্ষণ না করলে বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায় চিরতরে হারিয়ে যাবে।

এ বিষয়ে আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুমা বেগম জানান, গণশুনানির বিষয়টি তাঁর জানা নেই; তবে ঐতিহাসিক স্থানটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য খুব দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে চিঠি পাঠানো হবে।

দৈনিক পুনরুত্থান /

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন