‘আমি ফিরে এসেছি মানুষের জন্য’ মির্জা আব্বাসের কান্নাভেজা বক্তব্যে থমকে গেলো গোটা সংসদ
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার পর দেশে ফিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিয়েছেন বিএনপির হয়ে ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর তিনি সংসদে উপস্থিত হন। পরে সংসদে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বক্তব্যের একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই সংসদ সদস্য।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি না দাঁড়িয়ে বসেই বক্তব্য দেন। মির্জা আব্বাস বলেন, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের এই পবিত্র কক্ষে আবার কথা বলার সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত আনন্দ, গর্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়। তবে আমার চিকিৎসা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। চিকিৎসার মাঝপথেই কেবল মহান সংসদের প্রতি আবেগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে আমি অধিবেশনে যোগ দিয়েছি।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে মির্জা আব্বাস বলেন, ২০০৬ সালের পর আজ আবার মহান জাতীয় সংসদের এই পবিত্র কক্ষে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। দীর্ঘ সময় পর সংসদে ফিরে আসার এই দিনটিকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মরণীয় একটি দিন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ার পরপরই গত ১১ মার্চ ২০২৬ আমি গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হই। এরপর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দীর্ঘ সময় ধরে আমাকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন থাকার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সংসদের অধিবেশনে নিয়মিত উপস্থিত হতে পারিনি।
নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, আমি এখনো চিকিৎসাধীন। চিকিৎসা শেষ হয়নি, বরং চিকিৎসার মাঝপথে প্রথমবারের মতো সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পেরে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।
অসুস্থতার কঠিন সময়ে যারা তার জন্য দোয়া করেছেন, নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। দলীয় পরিচয়ের বাইরে যারা তার সুস্থতা কামনা করেছেন, তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কথা স্মরণ করে মির্জা আব্বাস বলেন, এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে তাদের দোয়া ও শুভকামনা আমাকে সাহস জুগিয়েছে।
মির্জা আব্বাস বিশেষভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অসুস্থতার সময়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন। এ জন্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
সংসদের স্পিকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, অসুস্থ অবস্থায় স্পিকার নিজে আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। সে সময় আমি অচেতন থাকায় স্পিকারকে দেখতে পারিনি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে আমি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হই।
স্পিকারের এই আচরণকে শুধু একজন অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা নয়, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের মানবিক দিকের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। মির্জা আব্বাস বলেন, একজন সংসদ সদস্য, একজন অসুস্থ মানুষ এবং একজন সহকর্মীর প্রতি স্পিকার হিসেবে যে আন্তরিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তিনি বলেন, এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
জাতীয় সংসদে ফিরে এসে রাজনীতির বৃহত্তর অর্থ নিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, জাতীয় রাজনীতি শুধু মতের পার্থক্যের বিষয় নয়; রাজনীতি মানুষের জন্য। একইভাবে সংসদ শুধু বিতর্কের জায়গা নয়, এটি দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জায়গা।
বক্তব্যে নিজের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিত্বকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।
মির্জা আব্বাস বলেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। মহান আল্লাহর কাছে তিনি সুস্থতা ও শক্তি কামনা করেন, যাতে নির্বাচনি এলাকার মানুষের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের জন্য জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যেতে পারেন।
দীর্ঘদিন পর সংসদে সহকর্মী সংসদ সদস্যদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। অসুস্থতার সময়ে সহকর্মীদের ভালোবাসা, শুভকামনা ও দোয়ার কথা উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস জানান, এসব তাকে কঠিন সময় অতিক্রম করতে সহায়তা করেছে।
২০০৬ সালের পর আবার সংসদের এই কক্ষে দাঁড়ানোর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি ফিরে এসেছি মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে।
দৈনিক পুনরুত্থান /
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: