আদালত কক্ষের ভাঙচুর: পেশাগত সংকট,নাকি রাজনীতির ছায়াযুদ্ধ?
নজরুল ইসলাম আলীম :
বরিশাল–এর আদালত কক্ষে ভাঙচুর এবং আইনজীবী নেতা এস. এম. সাদিকুর রহমান লিংকন–এর গ্রেফতার ঘটনাটি শুধু আইনজীবী সমাজের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং এটি দেশের রাজনীতি ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিকীকরণের একটি প্রতীকী চিত্র।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পেশাজীবী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। আইনজীবী সমিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে আদালতের ভেতরের যেকোনো উত্তেজনা প্রায়শই পেশাগত মতবিরোধের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থান, ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
জেলা আইনজীবী সমিতিগুলো শুধু পেশাগত সংগঠন নয়—অনেক ক্ষেত্রে এগুলো স্থানীয় রাজনীতির ‘মাইক্রো মডেল’। নেতৃত্ব নির্বাচন, প্যানেল গঠন, এমনকি মামলার প্রভাব—সবকিছুতেই দলীয় পরিচয় ও আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বরিশালের ঘটনাও সেই বাস্তবতার আলোকে দেখলে স্পষ্ট হয়, আদালতের ভেতরের উত্তেজনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিস্ফোরণ হতে পারে।
আদালত সাধারণত নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও, বাস্তবতা হলো—আদালত প্রাঙ্গণও অনেক সময় রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়।আইনজীবী নেতার গ্রেফতারের পর বিক্ষোভ, পাল্টা অবস্থান এবং বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে রাজনৈতিক অবস্থান কতটা গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে।এই প্রবণতা শুধু আদালতের পরিবেশকে উত্তেজিত করে না; বরং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ধারণাকেও দুর্বল করে।
ডিজিটাল যুগে একটি ভিডিও মুহূর্তেই রাজনৈতিক বয়ানের অস্ত্র হয়ে ওঠে। বরিশালের ঘটনাও সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও পাল্টা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।এক পক্ষ এটিকে প্রশাসনিক কঠোরতার উদাহরণ হিসেবে দেখছে, অন্য পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগ তুলছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা তদন্তাধীন থাকলেও রাজনৈতিক বিতর্ক ইতোমধ্যে জনমতকে বিভক্ত করেছে।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, কিন্তু তাদের পেশাগত আচরণে নিরপেক্ষতা ও সংযম অপরিহার্য। আদালতের ভেতরে উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা সেই ভারসাম্য ভেঙে দেয়।
বরিশালের ঘটনা তাই একটি বৃহত্তর সতর্কবার্তা—যদি পেশাজীবী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে তার প্রভাব বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতেই পড়বে।রাজনীতির প্রভাব কমানোর চ্যালেঞ্জ এই ঘটনার তদন্ত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে কীভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে রাখা যায়।আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগ এবং বার–বেঞ্চ সম্পর্কের উন্নয়ন রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।তবে বাস্তবতা হলো—রাজনীতির প্রভাব পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন; কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা সম্ভব।
বরিশালের আদালত কক্ষের আজকের ঘটনাটি একটি প্রতীক—যেখানে পেশাগত দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা একসঙ্গে মিশে গেছে।
এই ঘটনার পরিণতি যাই হোক, এটি স্পষ্ট যে আদালত ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক উত্তেজনার বাইরে রাখতে না পারলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।রাজনীতি গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু আইনের ঘরে তার প্রভাব যত কম থাকবে—ন্যায়বিচারের পথ ততই মসৃণ হবে।খদ
দৈনিক পুনরুত্থান / নজরুল ইসলাম আলীম :
- বিষয়:
- আদালত* কক্ষের,ভাঙচুর
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: