ভিটামিন-এ সংকটে ঝুঁকিতে কোটি শিশু, ব্যর্থতার ভারে নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা
মো: নজনুল ইসলাম খান আলিম :
চৌদ্দ মাসের অচলাবস্থা: ভিটামিন-এ সংকটে ঝুঁকিতে কোটি শিশু, ব্যর্থতার ভারে নত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা।।
বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্যের অন্যতম সফল কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন গত চৌদ্দ মাস ধরে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের কোটি কোটি শিশু প্রয়োজনীয় ভিটামিন-এ ক্যাপসুল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ভবিষ্যতে অপুষ্টি, রাতকানা, হাম, ডায়রিয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য খাতের অপারেশনাল প্ল্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংগ্রহের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি।ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন বাতিল করতে বাধ্য হয় স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি কর্মসূচি স্থগিত হওয়ার ঘটনা নয়; বরং দেশের শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও সংকট নিরসনে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ১০ জুনের মধ্যে এক কোটিরও বেশি ভিটামিন-এ ক্যাপসুল দেশে পৌঁছাবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও ক্যাপসুল না আসায় সেই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।একই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে অসঙ্গতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এক পক্ষ যেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমার কথা বলছে, অন্য পক্ষ সেখানে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরছে। ফলে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে অভিভাবকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু ক্যাপসুলের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নীতিনির্ধারণ, ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির ভবিষ্যৎ যখন "চেষ্টা চলছে" কিংবা "শিগগিরই হবে" ধরনের আশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতারই ইঙ্গিত বহন করে।বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় ভিটামিন-এ ঘাটতি মোকাবিলায় সফলতার নজির স্থাপন করেছিল। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাতকানার মতো রোগ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট সেই অর্জনকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা।তাদের মতে, শিশুস্বাস্থ্যের মতো একটি মৌলিক বিষয়ে দীর্ঘসূত্রিতা ও সমন্বয়হীনতা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্যাপসুল দেশে এলেও চৌদ্দ মাসের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব অনেক শিশুর শারীরিক বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে।সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, দ্রুত ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের সংকট কেন সৃষ্টি হলো, কারা দায়ী এবং ভবিষ্যতে যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
- বিষয়:
- ভিটামিন-এ* সংকটে,ঝুঁকিতে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: