বরগুনার টেংরাগিরি বনে গাছ কাটার মহোৎসব, প্রতিবাদ করলেই মামলার হুমকি!
তালতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি:
উপকূলীয় সুরক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল ও ‘দ্বিতীয় সুন্দরবন’ নামে পরিচিত বরগুনার তালতলীর টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন প্রকাশ্যেই উজাড় হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অসাধু বন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে প্রতিনিয়ত কেটে নেওয়া হচ্ছে বনের শত শত মূল্যবান গাছ। প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো স্থানীয়দের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। এমনকি সংবাদ প্রকাশ চেপে যেতে সাংবাদিকদের 'ম্যানেজ' করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৩ হাজার ৬৪৪ একরের এই সংরক্ষিত বনে বিট কার্যালয়ের ঠিক সামনেই এখন প্রকাশ্যে দিনদুপুরে চলছে গাছ কাটা। নলবুনিয়া বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা এবং 'শুভ সন্ধ্যা' সমুদ্র সৈকত পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, কেবল এক কিলোমিটারের মধ্যেই গত ৩-৪ দিনে অন্তত দুই শতাধিক গাছ কেটে নিয়ে গেছে পাচারকারীরা। প্রমাণের আলামত মোছাতে গাছের গোড়া ও শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হচ্ছে। কাটা কাঠ ট্রলারে তুলে নির্দ্বিধায় পাচার করা হচ্ছে নদীপথে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সবুজে ঘেরা তালতলী উপজেলার টেংরাগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অবৈধভাবে গাছ কাটার মহোৎসব। সম্প্রতি ছকিনা বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ের ঠিক সামনে এবং নলবুনিয়া বিট কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে গাছ কেটে ট্রলারে বেঁধে নদীপথে পাচার করা হচ্ছে। এছাড়া পর্যটন কেন্দ্র ‘শুভ সন্ধ্যা’ সমুদ্র সৈকত এলাকার মাত্র ১ কিলোমিটার বনের মধ্যেই গত ৩-৪ দিনে প্রায় দুই শতাধিক গাছ কেটে নিয়ে গেছে কয়েকটি পাচারকারী চক্র। চক্রটি রাতের আঁধারে কাঠ পাচারের পাশাপাশি অনেক গাছ বনের ভেতরেই ফেলে রাখছে সুবিধাজনক সময়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। চুরির আলামত ও প্রমাণ মুছে ফেলতে উপড়ে ফেলা হচ্ছে গাছের গোড়াও।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মিজান ও কবির হাওলাদার জানান, চোখের সামনে বন উজাড় হতে দেখেও তারা কিছু বলতে পারছেন না। গাছ কাটার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের উল্টো গাছ কাটার মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখান। ফলে চরম আতঙ্কে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একদিকে সরকার বৃক্ষরোপণ করছে, অন্যদিকে বন বিভাগের সহযোগিতায় চলছে বৃক্ষনিধন।
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর তালতলী শাখার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, “টেংরাগিরি বনাঞ্চলটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র বাতাসের আঘাত থেকে উপকূলের মানুষদের রক্ষা করে। এভাবে বন উজাড় হতে থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদ চরম দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়বে।”
গাছ কাটার বিষয়ে বক্তব্য জানতে নলবুনিয়া বিট কর্মকর্তা মো. শাওনের কাছে যাওয়া হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে চাননি, বরং সংবাদ প্রকাশ না করতে সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।
তবে বনের গাছ কাটার সত্যতা নিশ্চিত করে বন বিভাগের তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, “সরেজমিনে গিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটার সত্যতা পেয়েছি। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, “বন উজাড়ের বিষয়টি বেশ কয়েকবার বন বিভাগকে সতর্ক করে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।”
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: