পায়রা নদীর ভাঙনে বিলীনের পথে বাহেরচর গ্রাম; নিঃস্ব দেড় শতাধিক পরিবার
লিটু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার মুরাদিয়া ও আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামটি ধীরে ধীরে পায়রা নদীর পেটে চলে যাচ্ছে। অব্যাহত নদীভাঙনে গত কয়েক দিনে অন্তত ২০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে সরকারি সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভাঙনে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে।
ভাঙনের তীব্রতা অব্যাহত থাকায় বর্তমানে হুমকিতে রয়েছে ৩২ নম্বর আঙ্গারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, সিকদার বাড়ি জামে মসজিদ ও মোল্লা বাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু স্থাপনা।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিন দেখা যায়, পায়রা নদীর পাড়জুড়ে চলছে ভাঙনের তাণ্ডব। নদীর কিনারে ঝুলে রয়েছে বহু বসতভিটার শেষ অংশ। কোথাও আবার চোখে পড়ে সদ্য ভেঙে পড়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ। নদীর দিকে তাকিয়ে ভাঙনের আতঙ্কে অনেককে নিজেদের ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
যাদের বসতভিটা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, তাদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সরকারি সড়কের পাশে পলিথিন টাঙিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। খোলা আকাশের নিচে বা পলিথিনের ছাউনিতে রান্নাবান্না, সংসারের মালামাল রাখা এবং শিশুদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই অসহায় মানুষগুলো।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বাহেরচরের নদীভাঙন নতুন কোনো সমস্যা নয়। যুগের পর যুগ ধরে পায়রা নদীর ভাঙনে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন থেকে বাঁচতে অনেক পরিবার জীবনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত ঘর সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এবার নদী এমন এক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, অনেকের সামনে আর নতুন করে যাওয়ার বা মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই।
ভাঙনে সর্বস্ব হারানো নিটুলী রানী আক্ষেপ করে বলেন, “ইতিমধ্যে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছি। সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও নদী নিয়ে গেছে। এখন রাস্তার পাশে থাকতে হচ্ছে। যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দা কবির বলেন, “অনেকেই আসেন, অনেক কথা বলেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। কেউ আমাদের দুর্ভোগের দিকে তাকায় না।”
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত রিপন মাল জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে ভাঙন চলছে। জীবনে পাঁচ-ছয়বার ঘর সরিয়ে এখন বাধ্য হয়ে বাজারে ভাড়া বাসায় থাকছেন তিনি। ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুস সাত্তার খানের কণ্ঠেও ঝরে পড়ে একই হাহাকার। তিনি বলেন, বারবার ভাঙনে এখন তাঁদের কিছুই অবশিষ্ট নেই।
ভাঙন অব্যাহত থাকায় বাহেরচরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিনের দাবি, এ পর্যন্ত বাহেরচর এলাকায় প্রায় ৩৫০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে নদীর ওপারে নতুন চরে ৬০টি পরিবারের জন্য ৯০ একর জমি সরকার বরাদ্দ দিয়েছিল। তবে বাকেরগঞ্জের কিছু মানুষ ওই জমি দখল করে রাখায় বাহেরচরের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সেখানে আশ্রয় নিতে পারেনি।’
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসন এবং গ্রামটিকে রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
আঙ্গারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাহেরচর গ্রামকে রক্ষা করতে এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলোর সহায়তায় প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে দুমকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: