• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. জাতীয়

জন্ম থেকেই বাঁ হাত নেই, কটু কথা শোনা সেই নাজমা এখন চাকরিজীবী


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৪৩ পিএম;
জন্ম থেকেই বাঁ হাত নেই, কটু কথা শোনা সেই নাজমা এখন চাকরিজীবী

চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:

 

জন্ম থেকেই বাঁ হাতের কনুই পর্যন্ত নেই। শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতাকে পুঁজি করে সমাজের অনেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সব প্রতিকূলতা ও কটু কথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে আজ সফলতার দেখা পেয়েছেন কক্সবাজারের চকরিয়ার নাজমা আকতার (২৮)। 
লড়াই-সংগ্রাম পেরিয়ে তিনি এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সফলভাবে হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

নাজমা আকতার কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার দক্ষিণ কাহারিয়াঘোনা এলাকার ছালাম মাস্টারপাড়ার নাছির উদ্দিন ও নুর আয়েশা বেগম দম্পতির ছোট মেয়ে। তাঁর বাবা বন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং মা গৃহিণী। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবাই স্বাভাবিক থাকলেও কেবল নাজমা জন্মগতভাবে এক হাতহীন অবস্থায় দুনিয়ায় আসেন।

নাজমার জন্মলগ্নে এলাকার কিছু মানুষ ও স্বজনেরা তাঁর মা-বাবাকে বলতেন, ‘ও তো প্রতিবন্ধী, ওকে দিয়ে কিছু হবে না। সারা জীবন ঘরে রেখেই খাওয়াতে হবে।’ এমনকি এক নারী তাঁর মাকে বলেছিলেন, ‘বড় হলে মেয়েটির বিয়েও হবে না, সারা জীবন তাকে পালতে হবে।’ তবে এসব কটূক্তি বা নেতিবাচক কথা নাজমার বাবা-মাকে দমাতে পারেনি; বরং তাঁরা মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার দৃঢ় সংকল্প করেন।

পরিবারের এই স্বপ্ন পূরণে নাজমাও পড়াশোনায় চরম একাগ্রতা বজায় রাখেন। তবে স্বল্প আয়ের সংসারের আর্থিক চাপ সামলাতে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই তিনি টিউশনি শুরু করেন। এমনকি স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার সময় তাঁকে লজিংয়েও থাকতে হয়েছে। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে তিনি সরকারি উপবৃত্তি ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকার সদ্ব্যবহার করেছেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের পথচলা ছিল বেশ উজ্জ্বল:

২০১৩: চকরিয়া কেন্দ্রীয় উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস।

২০১৫: চকরিয়া কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস।

২০২০: কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন।

২০২১: চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন।


২০২৩ সালে পূর্বপরিচিত মিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে নাজমার বিয়ে হয়। চকরিয়া পৌরসভায় তাঁর স্বামীর প্রসাধনীর একটি দোকান রয়েছে। বর্তমানে এই দম্পতির সংসারে ১৪ মাসের একটি সন্তান রয়েছে। কর্মজীবন ও সংসার সামলানোর নেপথ্যে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অসামান্য সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন নাজমা। তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুবই ভালো মানুষ। আর আমার স্বামী সবসময় আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর সাপোর্ট না থাকলে আমার পক্ষে এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হতো না।’

বর্তমানে নাজমা ‘সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ফর দ্য ফিজিক্যালি ভালনারেবল’ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রতিবন্ধকতা জয় করার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নাজমা আকতার বলেন, ‘ছোট থেকেই মানুষের অনেক কটু কথা শুনেছি। কষ্ট পেলেও আমি দমে যাইনি। আজ নিজের এলাকায় ভালো বেতনে চাকরি করছি। এখন আর কেউ আমাকে কটু কথা বলেন না। মূল কথা, একাগ্রতা নিয়ে পড়াশোনা করলে সমাজ জয় করা কোনো ব্যাপারই নয়।’

নাজমার কর্মদক্ষতার প্রশংসা করে ওই প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক পরিচালক কাজী মাকসুদুল হক বলেন, ‘কাজের দক্ষতায় নাজমা আকতার এমন একজন মানুষ, যাঁর দিকে তাকালে কারও মনেই হবে না যে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। তিনি এক হাত নিয়েই নিজের সমস্ত কাজ সারেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অফিস সামলান। এককথায়, তিনি প্রকৃত অর্থেই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন।’

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন