• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২

Advertise your products here

  1. অপরাধ

উত্তরবঙ্গে সেচ কার্যক্রমে ৩৮ বছরের অনিয়ম গ্রামীণ ব্যাংকের


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:৩৫ এএম;
উত্তরবঙ্গে সেচ কার্যক্রমে ৩৮ বছরের অনিয়ম গ্রামীণ ব্যাংকের

নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের অ-নোবেলীয় কর্মকাণ্ড

উত্তরবঙ্গে সেচ কার্যক্রমে ৩৮ বছরের অনিয়ম

 রুকনুজ্জামান অঞ্জন ও তাওসিফ মাইমুন

 

প্রিয় পাঠক, শিরোনাম দেখে অনুমান করতে পারেন যে, প্রতিবেদনটি গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ প্রদান সম্পর্কিত অনিয়ম নিয়ে করা। আসলে তা নয়। আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছি, যেখানে গ্রামীণ ব্যাংকের সংশ্লেষ থাকার কথা ছিল না; কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তাই।

সাবেক সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে উত্তরবঙ্গে সেচ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছিল ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থা গ্রামীণ ব্যাংক। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও সক্ষমতা না থাকায় সে কাজটি ঠিকঠাক করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। উপরন্তু সেচ কার্যক্রমের জন্য ১৫০০ গভীর নলকূপ নেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেও সে চুক্তি রক্ষা করেনি। শুধু ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করার পর গত ৩৮ বছরে সেই টাকাও সরকারকে পরিশোধ করেনি।

উত্তরবঙ্গে গভীর নলকূপ প্রকল্প : উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে কৃষির উন্নয়নে ১৯৮৭ সালে গভীর নলকূপ স্থাপনের যৌথ উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ-সৌদি সরকার। তখনকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের বাসিন্দা। ফলে সেই সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন অবহেলিত ওই অঞ্চলটির কৃষির উন্নয়নে তিনি সৌদি সরকারের সহায়তা চান। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে সৌদি উন্নয়ন তহবিলের (এসইডি) অনুদানে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় গভীর নলকূপ প্রকল্পের আওতায় ২০০০ গভীর নলকূপ স্থাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক স্থাপনে এরশাদ : অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর্তৃক ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক। ১৯৮৩ সালের ২ অক্টোবর একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়। তৎকালীন সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অধ্যাদেশ জারি করে ‘গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩’ এর মাধ্যমে একে রাষ্ট্রীয় বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সেচ প্রকল্পে গ্রামীণ ব্যাংক : উত্তবঙ্গে গভীর নলকূপ প্রকল্পটি যখন গ্রহণ করা হয়, তখন সেই খবরটি যায় গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসের কাছে। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই প্রকল্পটিকে বড় ধরনের সুযোগ হিসেবে নেন। সেচ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অতীত অভিজ্ঞতা ছিল না ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের। তবুও তিনি এই কার্যক্রমে নিজের প্রতিষ্ঠানটিকে জড়িত করার উদ্যোগ নেন। গ্রামীণ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেচ কার্যক্রমে জড়িত থাকার সুযোগ ছিল না। এ পর্যায়ে তিনি তখনকার রাষ্ট্রপতি এরশাদের সহায়তা কামনা করেন। পাশাপাশি সেচ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এরশাদ উত্তরবঙ্গের কৃষির উন্নয়নে ড. ইউনূসের পরিকল্পনায় বুঁদ হয়ে যান। খুব দ্রুতই ফলাফল মেলে। আগাম কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও বিএডিসির সেচ প্রকল্পের ২ হাজার নলকূপের মধ্যে ১৫০০ নলকূপ নেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় গ্রামীণ ব্যাংক। সৌদি উন্নয়ন তহবিলের অনুদানে স্থাপিত ১৫০০ গভীর নলকূপ গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করার জন্য বিএডিসিকে নির্দেশ দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।

মাত্র সাড়ে  হাজার টাকায় গভীর নলকূপের মালিকানা : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সেচ কার্যক্রমে গ্রামীণ ব্যাংকের জড়িত হওয়ার পুরো বিষয়টি যেহেতু তখনকার সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ঘটেছিল, সে কারণে এ বিষয়ে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়, সেই চুক্তিকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করে ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক। ১৯৮৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে বিএডিসির চুক্তি হয়। প্রতিটি নলকূপের মূল্য ধরা হয়, ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সে হিসেবে ১৫০০ গভীর নলকূপের মূল্য দাঁড়ায় ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিটি নলকূপের জন্য ৬ হাজার ৫০০ টাকা ডাউন পেমেন্ট ধরে, ১৫০০ নলকূপের বিপরীতে মাত্র ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে। এ পর্যায়ে শুরু হয়, গভীর নলকূপ হস্তান্তর।

এরশাদ পতনের আগেভাগে চুক্তিভঙ্গ : ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরশাদ সরকারের পতনের কয়েকদিন আগে ১৯৯০ সালের ১৮ অক্টোবর গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ৫৬৯টি নলকূপ গ্রহণ করার পর কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেয়, তারা আর কোনো নলকূপ গ্রহণ করবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি কোনো সাধারণ চুক্তিভঙ্গ ছিল না। এর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সেচ কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ জড়িত ছিল। ফলে মাত্র দুই বছরের মাথায় এক তৃতীয়াংশ নলকূপ গ্রহণ করে গ্রামীণ ব্যাংকের সরে দাঁড়ানোর কারণে উত্তরবঙ্গে সেচ কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ে যায়। এ অবস্থায় বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার কৃষি প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৫৬৯টি এবং টাঙ্গাইল জেলার ৪টিসহ মোট ৫৭৩টি গভীর নলকূপের বিক্রয়মূল্য ৯ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দফায় দফায় গ্রামীণ ব্যাংককে তাগিদ দেওয়া হয়। ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক কখনোই সেই অর্থ পরিশোধ করেনি। গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃক অর্থ পরিশোধ না করায়, বিএডিসির রংপুর, দিনাজপুর জোনের আওতায় প্রায় ২ কোটি ৮১ লাখ টাকার অডিট আপত্তি ঝুলে আছে, যা নিষ্পন্ন করা যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, শুধু যে অর্থ পরিশোধে গ্রামীণ ব্যাংকের টালবাহানা ছিল তাই নয়, তাদের কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান না থাকায় গভীর নলকূপগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছিল না ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে অনেক নলকূপ নষ্ট হয়ে যায়। একপর্যায়ে বেশ কিছু নলকূপ সরকারের নির্দেশে বিএমডিএ (বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)-কে হস্তান্তর করে বিএডিসি।

পাওনা পরিশোধ না করায় গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা : গভীর নলকূপ গ্রহণ করে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় ২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের নামে সার্টিফিকেট মামলা করে বিএডিসি যার নং ছিল-৭৫ (বিএডিসি)/২০১১। সূত্র জানায়, দীর্ঘ শুনানি শেষে ওই মামলায় বিএডিসির পক্ষে রায় হয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে পতন ঘটে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে সরকারের ক্ষমতায় আসীন হন শান্তিতে নোবেলজয়ী গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আলোচ্য সময়ে অর্থ পরিশোধের সার্টিফিকেট মামলার রায়ের বিপরীতে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে আপিল মামলা করে গ্রামীণ ব্যাংক যার নং ১০২৮/২০২৪।

সমস্যা সমাধানে ত্রিপক্ষীয় জরিপ : অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখতে মামলা করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমঝোতা কার্যক্রম চলতে থাকে গ্রামীণ ব্যাংকের। মামলার রায় ও চুক্তি অনুযায়ী ৫৭৩টি নলকূপের মূল্য বাবদ ৯ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও গ্রামীণ ব্যাংক আপত্তি জানায়। তখন প্রশ্ন ওঠে কতগুলো নলকূপের অর্থ পরিশোধ করবে গ্রামীণ ব্যাংক। এ প্রেক্ষাপটে ওপরের নির্দেশে, গভীর নলকূপগুলো বর্তমানে কার আওতায় আছে, সেই তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। গ্রামীণ ব্যাংক তথা গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন, বিএডিসি এবং বিএমডিএ-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ত্রিপক্ষীয় জরিপ চালায়। ওই জরিপের তথ্যে দেখা যায়, ৫৭৩টি গভীর নলকূপের মধ্যে বিএডিসির আওতায় ৪১টি, বিএমডির আওতায় ৩৫৩টি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের আওতায় ১৭৯টি নলকূপ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ছাড়ার আগে সমঝোতার সুপারিশ : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন। তার আগেভাগে গত ১৪ জানুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৮৮ সালে ধার্যকৃত মূল্য অনুযায়ী প্রতিটি নলকূপের দাম ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধরে, ১৭৯টি নলকূপের মোট পরিশোধ করবে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিকালীন ১৫০০ নলকূপ নেওয়ার জন্য যে ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করেছিল ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সেই টাকা বাদ দিয়ে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পাবে গ্রামীণ ব্যাংক। এতে করে, ১৭৯টি নলকূপের মূল্য ৩ কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাদ দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংককে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১৫০০টি নলকূপ নেওয়ার চুক্তি করে ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করে কার্যক্রম চালিয়ে এখন দীর্ঘ ৩৮ বছর পর বৈঠকে যে সিদ্ধান্তটি আসে, সেখানে সরকারের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি অনুযায়ী ১৫০০টি নলকূপ কেনার চুক্তি করে ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করার পর নলকূপ না নিলে সেই ডাউনপেমেন্ট বাতিল হওয়ার কথা। চুক্তিবদ্ধ নলকূপ গ্রহণ না করায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। এমনকি ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করে ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ফলে ওই নলকূপগুলোর পরিচালনাবাবদ অর্জিত অর্থ এবং অবচয়জনিত ক্ষতিপূরণও দেওয়ার কথা গ্রামীণ ব্যাংকের। এসব শর্ত পূরণ না করে, শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের আওতায় থাকা ১৭৯টি নলকূপের অর্থ পরিশোধের সুপারিশ আদালতের রায়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫৭৩টি নলকূপ ২০১০ সাল পর্যন্ত (মোট ২২ বছর) গ্রামীণ ব্যাংক তথা গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন পরিচালনা করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সরকারের নির্দেশে বিএডিসি বিএমডিএকে কয়েকটি গভীর নলকূপ হস্তান্তর করে। এতে গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশনসহ সরকারের দুই সংস্থার আওতায় ৫৭৩টি গভীর নলকূপ ভাগ হয়ে যায়। সূত্রগুলো জানান, নলকূপগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এতে করে সরকার গত ৩৯ বছরে কোটি কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সক্ষমতা না থাকায় গ্রামীণ ব্যাংকের আওতায় নলকূপগুলো ধ্বংস হচ্ছিল। শেষে সরকারের নির্দেশে ৩৯৪টি নলকূপ সচল রাখা গেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে থাকা অধিকাংশ নলকূপ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

জানতে চাইলে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এর প্রকৌশলী তত্ত্বাবধায়ক মো. আবদুল লতিফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের নির্দেশে আমরা ৩৫৩টি গভীর নলকূপ পরিচালনা করছি। কৃষক কার্ড সিস্টেমে আমাদের পাম্প থেকে সেচ দিতে পারছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, গভীর নলকূপ পরিচালনার জন্য টেকনিক্যাল দক্ষতার প্রয়োজন। ১৯৮৮ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ৫৭৩টি নলকূপ নিলেও তারা ২০১০ সাল পর্যন্ত এগুলো পরিচালনা করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় যোগাযোগ করলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বিএডিসির কর্তৃপক্ষ একটি মামলা দায়ের করে। মামলার রায় আমাদের পক্ষে এলেও ব্যাংক আমাদের সেই টাকা পরিশোধ না করে আপিল করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে ১৭৯টি নলকূপের ১ লাখ ৭৫ হাজার সমমূল্যের ২ কোটি ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরদার আকতার হামিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গভীর নলকূপ সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে আমরা কোনো মন্তব্য করব না। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হবে।

যোগাযোগ করা হলে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মন্ত্রণালয়ে নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি মাত্র শুনলাম। আমি এ বিষয়ে খোঁজ নেব। এ ছাড়া আমাদের মন্ত্রণালয়ের যিনি উইং চিফ হিসেবে বিএডিসি দেখেন, তিনি চিকিৎসাজনিত কারণে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে বিষয়টি পুরোপুরি না জেনে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে জানান কৃষি সচিব।

২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। দারিদ্র?্য দূরীকরণ, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে অসামান্য অবদানের জন্য তাদের এই সম্মান প্রদান করা হয়। এটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র নোবেল জয়। এ ধরনের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওপরের অভিযোগগুলো নোবেলপ্রাপ্তির মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক যে কার্যক্রম করেছে, তাতে শুধু সরকারের ক্ষতি হয়েছে, তাই নয়- যে অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা চুক্তি করেছিল, সেই অঞ্চলের কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি সময়ে এ বিষয়ে সমঝোতা করেছে, যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এবং সেই সরকারের প্রধান ছিলেন এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা। এখানে সততা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মনে করছি। এখন নির্বাচিত সরকারের উচিত পুরো ঘটনা পর্যালোচনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিটি করার। ওই কমিটি যে প্রতিবেদন দেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করাই ন্যায্য হবে।

সুত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন