লুটের সম্রাট ডিআইজি মোজাম্মেল
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক। রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন পুলিশের মহান পেশায়। কিন্তু হায়! তিনি পুলিশের পবিত্র পোশাকের আড়ালে সেটিতে কালিমালেপন করেছেন দুর্নীতি, লুটপাট আর দখলের সাম্রাজ্য গড়ার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার দাপট আর ঊর্ধ্বতনদের ব্যবহার করে জমি দখল, নদী ভরাট এবং শত শত কোটি টাকার সম্পদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন সুপরিকল্পিত দক্ষতায়।
একাধিক অনুসন্ধান, নথিপত্র এবং স্থানীয়দের অভিযোগ বলছে, নিজের পদ-পদবিকে তিনি সম্পদ গড়া আর দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। গত বছর পুলিশের এই কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অবসরে গেছেন। স্থানীয়রা তাঁকে আখ্যা দিচ্ছে দ্বিতীয় বেনজীর (সাবেক দুর্নীতিবাজ আইজিপি) হিসেবে।
অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, প্রায় ২৬ বছরের চাকরিজীবনে তিনি গড়ে তুলেছেন শত শত কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য।
রাজধানীর উপকণ্ঠ রূপগঞ্জে রয়েছে নানাভাবে দখল করা প্রায় তিন হাজার বিঘার আবাসন প্রকল্প। এর পাশে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে রয়েছে বাগানবাড়ি (বর্তমান মূল্য প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা)। বান্দরবানে এক দাগে ১৭৫ বিঘা জমি রয়েছে। সেখানে আতর চাষ করা হয়।
রূপগঞ্জের জিন্দাপার্ক এলাকায়ও বিস্তর জমি রয়েছে। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকায় তাঁর ভায়রার নামে কয়েক বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। ডেমরার সারুলিয়া টেংরা এলাকায় ৩১ শতাংশ জমিতে রয়েছে স্ত্রীর নামে ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস। এ ছাড়া কুমিল্লার মেঘনা নদীর বুকে রিসোর্টসহ নানা সম্পদ, সুনামগঞ্জে সম্পত্তিসহ সব মিলিয়ে এক বিস্ময়কর সম্পদের তথ্য মিলেছে।
জানা যায়, নামসর্বস্ব আনন্দ পুলিশ হাউজিং ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আনন্দ প্রপার্টিজের একটি সিস্টার কনসার্ন হিসেবে ছিল।
কিন্তু সে বছরই ৩১ মার্চ কালের কণ্ঠে পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের সংবাদ প্রকাশের পর তড়িঘড়ি করে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে রেজিস্ট্রার অব জয়েন স্টকে এটির আলাদা কম্পানি হিসেবে নিবন্ধন করা হয়।
অনুসন্ধান বলছে, কিভাবে একটি আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শত শত বিঘা জমির মালিকানা তৈরি হয়েছে, কিভাবে সেই সম্পদের বড় অংশ স্থানান্তরিত হয়েছে স্ত্রীর নামে, সেই বিতর্ক এখন নতুন করে রূপ নিচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার রূপগঞ্জে আনন্দ হাউজিং সোসাইটি ও পুলিশ আনন্দ হাউজিং আবাসনে সরেজমিনে গেলে গণমাধ্যমের গাড়ি দেখে কর্তব্যরত সিকিউরিটি গার্ডরা আটকে দেন। ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। তবে সেখানে বর্তমানে পুলিশ আনন্দ হাউজিং নামে কোনো সাইন বোর্ড দেখা যায়নি। নাম বদল করে তা হয়েছে আনন্দ হাউজিং। কারণ জানতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ডরা জানান, স্যারের (মোজাম্মেল) নির্দেশনা রয়েছে, অপরিচিতরা যেন এখানে ঢুকতে না পারে। তবে তাঁদের স্যার এখানে আসেন কি না জানতে চাইলে উত্তর দেননি।
এই দুই নামের আবাসনে পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা অন্য পুলিশদের সম্পর্ক রয়েছে কি না জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, এটি আমাদের স্যারের একান্তই ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এখানে পুলিশ সদর দপ্তরের কোনো যোগসূত্র নেই। পরে পাশের রাস্তা দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার গেলে বিশাল বাগানবাড়ির দেখা মেলে। সেখানে চারদিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে গরুর খামারও রয়েছে। এগুলো তদারকি করছেন কয়েকজন কর্মচারী। আর বাইরে অপরিচিত মানুষজন গেলেই তাঁরা সতর্ক হয়ে যাচ্ছেন। পুরো বাড়ি সুউচ্চ সীমানা প্রাচীরে ঘেরা। ওপরে কাঁটাতারের বেড়া। বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি।
ক্ষমতার উত্থান ও সম্পদের বিস্তার : ১৯৯৭ সালে ১৭তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী কমিশনার (এসি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন গাজী মোজাম্মেল হক। দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি বাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শাখায় কর্মরত ছিলেন। অতিরিক্ত ডিআইজি হওয়ার পরও এই শাখায় ছিলেন তিনি। পুলিশের এই শাখার কাজ বাহিনীর জমিজমা দেখাশোনা করা। আর এই সুযোগ পুরোদস্তুর ব্যক্তিগতভাবে অপকর্মে কাজে লগিয়েছেন তিনি।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে তাঁর পরিবারের। যার বড় অংশই কৌশলে তাঁর স্ত্রীর নামে স্থানান্তরিত। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ত্রীর নামে সম্পত্তি দেওয়া এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। এর মূল কারণ অনুসন্ধান বা তদন্তের সময় দায় এড়ানো।
আনন্দ পুলিশ হাউজিং নামের আড়ালে বিতর্ক : রূপগঞ্জে পূর্বাচলের পাশে গড়ে ওঠে ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’ নামে একটি বিশাল আবাসন প্রকল্প। নামের মধ্যেই ‘পুলিশ’ শব্দ থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি সরকারি বা পুলিশ-সম্পৃক্ত প্রকল্প হিসেবে প্রচার পেয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান বলছে, এই নামে কোনো বৈধ সমবায় সমিতির অস্তিত্ব নেই, পুলিশ সদর দপ্তরের সঙ্গেও এর কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। প্রকল্পটি মূলত একটি ব্যক্তিনির্ভর উদ্যোগ। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। বর্তমানে যার নাম শুধু আনন্দ হাউজিং। এদিকে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে রয়েছে ‘আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। ফারজানার নামে রূপগঞ্জের বিভিন্ন মৌজায় বিস্তর জমি রয়েছে। সব মিলিয়ে এসবের বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি ২০০৭ সালে এই আবাসন প্রকল্পের যাত্রা শুরু। গাজী মোজাম্মেল ২০০৬ সাল থেকে রূপগঞ্জে জমি কেনা শুরু করেন। পরের বছর পুলিশের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠন করেন ‘আনন্দ পুলিশ পরিবার কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এরপর আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি নামে আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। গাজী মোজাম্মেল প্রকল্প পরিচালক। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দ যুক্ত করা হয়েছে ব্যাবসায়িক সুবিধার জন্য।
গাজী মোজাম্মেলের স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল কাগজপত্রে আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কম্পানিটি নিবন্ধিত হয় ২০১৩ সালের ১৬ জুন। নথিপত্র অনুযায়ী, আনন্দ প্রপার্টিজের ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে সাড়ে ১৩ হাজারের মালিকানা ফারজানার নামে, যা মোট শেয়ারের ৯০ শতাংশ। বাকি দেড় হাজার শেয়ারের মালিক অপর দুই ব্যক্তি। যাঁরা প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে দাউদপুর ইউনিয়নের ওলপ গ্রামে ৩০ বিঘা জমি কিনেছেন, যার বর্তমান বাজারদর প্রায় ৩০ কোটি টাকা। সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো মৌজায় সরকারি সম্পত্তি দখল করে ৮৩ শতাংশ জমিতে বাড়ি নির্মাণ করছেন। বর্তমানে আরো জমি কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সুনামগঞ্জের হাসাউড়ায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ১০০ বিঘা জমি রয়েছে।
ভয়, চাপ ও অভিযোগের জাল : মোজাম্মেল যেখানে জমি নিয়েছেন, সেখানেই স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুতর। অনেককে জোরপূর্বক জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে। বাজারমূল্যের তুলনায় নামমাত্র দামে জমি নেওয়া হয়েছে। হুমকি ও মামলা দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। আবার কাউকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে জমি লিখে নিয়েছেন। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, জমি বাঁচাতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাননি। রূপগঞ্জে আবাসান প্রকল্পের জন্য জোর করে জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।
রূপগঞ্জের কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, জোর করে তাঁদের জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করায় তাঁদের ওপর হামলা করা হয়েছে। চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলা দিয়েও হয়রানি করা হয়েছে।
১০ দিন রিমান্ডে রেখে জমি লিখে নেন : অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে রূপগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ জাহের আলীকে টানা ১৩ দিন ডিবি অফিসে আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল। জাহের আলীর ভাষ্য, তাঁর ব্যক্তিমালিকানাধীন মোট ৬২ বিঘা জমি মোজাম্মেলের নামে লিখে দিতেই তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়েছিল। নির্মম নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে শেষ পর্যন্ত নিজের জমি মোজাম্মেলের নামে লিখে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। এ ঘটনা তখন গণমাধ্যমেও ফলাওভাবে প্রকাশ হয়েছিল। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত এ ঘটনাটি অবগত হয়েছিলেন। এ বিষয়ে জাহের আলীর পুত্রবধূ আফরোজা আক্তার আঁখি বাদী হয়ে মোজাম্মেল, তাঁর স্ত্রী ফারজানাসহ ২০ জনের নামে মামলা করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের সব জমি এখনো রক্ষা করতে পারেননি কোনোভাবেই।
স্ত্রীর নামে সম্পদ স্থানান্তরের কৌশল : মোজাম্মেলের অবৈধভাবে করা এই সম্পদের বড় অংশই রয়েছে স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে। ‘আনন্দ প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি কম্পানির মাধ্যমে এই সম্পদের একটি অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। নথি অনুযায়ী-কম্পানির ৯০ শতাংশ শেয়ার তাঁর স্ত্রীর নামে। অন্য শেয়ারহোল্ডারদের প্রকৃত ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কম্পানির ঘোষিত সম্পদের চেয়ে বাস্তব সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া ঢাকার ডেমরায় ফারজানা মোজাম্মেলের নামে আছে পশুপাখির ওষুধ তৈরির কারখানা ব্রিজ ফার্মাসিউটিক্যালস।
আবাসন প্রকল্পের জমি কেনাবেচায় সবখানে প্রকাশ্যে পর্দার সামনে থাকেন অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক। প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নথিপত্রে সইও করেছেন তিনি। এমনকি প্রকল্পের কর্মচারী ও কর্মকর্তারাও কালের কণ্ঠের কাছে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, এই প্রকল্পের মালিক মোজাম্মেল। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচ এড়াতে কৌশলে স্ত্রীর নামে খুলে দিয়েছেন একটি কম্পানি।
স্ত্রীর নামে আরো যত সম্পদ : অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বড়কান্দা ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে। সেখানেও স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের নামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। এর মধ্যে ২০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল বাগানবাড়ি ও মৎস্য খামার। নাম দিয়েছেন ‘মেঘনা রিসোর্ট’। এই প্রকল্পের বিশেষ দিক হলো—নদীর ভেতরে বালু ফেলে কৃত্রিম চর তৈরি করা হয়েছে। শুধু রিসোর্টই নয়, হরিপুরে স্ত্রী ফারাজানার নামে চারতলা ভবনের সুরম্য অট্টালিকা গড়ে তুলেছেন মোজাম্মেল। এই বাড়ি থেকে রিসোর্টে যেতে হয় ট্রলারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতে বালু ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষের নদীতে প্রবেশ সীমিত হয়ে গেছে এবং পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লার মেঘনা এলাকার সরেজমিন বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাসীন সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও বর্তমানে তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী প্রবাসী সেন্টু মিয়া বলেন, তাঁদের প্রায় ১২০ শতাংশ ফসলি জমি জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। আগে এখানে ধান, তরমুজ, খিরাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হতো। বর্তমানে ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না এবং কোথাও গিয়েও এর সুরাহা পাচ্ছেন না। বিভিন্ন জেলার লোকজন দিয়ে এসব সম্পদ পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নদী খননের (ড্রেজিং) নামে মেঘনা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে তার একটি অংশ নিজের পুকুর ভরাট করেছেন এবং বাকি অংশ বিক্রি করা হয়েছে, যা জনগণের কোনো উপকারে আসেনি।
সূত্র আরো জানায়, গাজী মোজাম্মেল হক বর্তমানে চাকরি থেকে অবসরে আছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেই মামলা চলমান। তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছেন না ভুক্তভোগীরা। সর্বশেষ গত ১৪ মার্চ নিজ গ্রামে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁকে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজ এলাকার বাইরেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সাবেক এই অতিরিক্ত ডিআইজি। তবে কৌশলে প্রায় সবখানেই সম্পদের মালিকানা দিয়েছেন স্ত্রীর নামে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গার চর ইউনিয়নের হাসাউড়া গ্রামেও তাঁদের একটি বাগানবাড়ির খোঁজ পায় কালের কণ্ঠ। অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসাউড়া গ্রামের বাড়িটি গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর। বর্তমানে এই জমির মূল্যও কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই বাগানবাড়ির জন্য জমি কেনার পাশাপাশি দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন মোজাম্মেল। পুরো অর্থ পরিশোধ না করেই জমি দখল করেছেন তিনি। মোজাম্মেলের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল ম্যানেজার সিদ্দিক মিয়া। তাঁর মাধ্যমেই সব কাজ করানো হতো বলে জানা গেছে।
অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলমান : দুদক সূত্র বলছে, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের নামে মোট কয়েক কোটি টাকার সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট ২২ কোটি ৯৬ লাখ ৪১ হাজার ৯৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে তাঁর ব্যয় হয়েছে চার কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৪০৭ টাকা। ফলে মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার ৩৮২ টাকা।
অন্যদিকে এই সম্পদের বিপরীতে তাঁর বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ১৮ হাজার ৩১৩ টাকা। ফলে হিসাব অনুযায়ী তাঁর নামে জ্ঞাত আয়ের উৎসর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার ৬৯ টাকা। বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল, যিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধেও অনুরূপ অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তাঁর নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকার সম্পদ রয়েছে।
একই সময়ে তাঁর পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে দুই কোটি ৭৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৬২ টাকা। ফলে মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আট কোটি ৩১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর বিপরীতে তাঁর বৈধ আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে পাঁচ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৯০৩ টাকা। ফলে তাঁর ক্ষেত্রেও জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৫ টাকা।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উভয়ের সম্পদের এই অসামঞ্জস্যতা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। বিষয়টি নিয়ে আরো গভীর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা তাঁদের দুজনের সম্পদের বিবরণী দাখিলের নোটিশ দাখিল করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা যে সম্পদ বিববরণী দাখিল করেছেন, তা যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মোজাম্মেল হকের নামে থাকা ৬৫ বিঘা জমি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল ও সন্তান গাজী বুশরা তাবাসসুমের নামে থাকা বেশ কয়েকটি জমি জব্দেরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের ২৮টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এসব বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা ধরেননি গাজী মো. মোজাম্মেল হক।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রবণতা অন্য সদস্যদের আরো বেপরোয়া করে তুলবে। এসবের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বর্তমান নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, যাঁদের হাতে দুর্নীতিসহ সব অপরাধের প্রতিকারের জন্য আইনের রক্ষকের দায়িত্ব অর্পিত, তাঁদেরই অনেকে আইনের ভক্ষকের ভূমিকাসহ সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ সত্ত্বেও বিচার দূরে থাক, ধারাবাহিকভাবে ‘সততা পুরস্কারে’ ভূষিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-ব্যবসা ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ অন্য প্রভাবশালী মহলের উইন-উইন যোগসাজশে তাঁরা সুবিধাভোগী ও সুরক্ষাকারী থাকেন।
সুত্র : কালের কন্ঠ (০১ এপ্রিল ২০২৬)
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: