মাতৃস্নেহে বাবার মুখে খাবার তুলে দিলো তুবা; পাশে দাড়ালেন মানবিক ইউএনও সুজা
খুঁটিতে বাঁধা অপমানিত বাবার মুখে খাবার তুলে দিল ৯ বছরের ‘মা’ তুবা: পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়লেন ইউএনও মো. আলী সুজা
বিশেষ প্রতিবেদন:
ভোররাতের কনকনে আবহাওয়া আর ইটের তৈরি কঠোর সমাজের নির্মমতা ভেদ করে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল বাজার সাক্ষী হলো এক অলৌকিক মাতৃরূপের। বিদ্যুতের শক্ত খুঁটিতে শক্ত করে বাঁধা নিস্তেজ এক পুরুষ, চুরির অপরাধের তকমা গায়ে চাপিয়ে যাকে সারারাত আটকে রাখা হয়েছে। চারপাশে জমাট বাঁধা কৌতূহলী ও বিচারক রূপী জনতার ভিড়। সেই শৃঙ্খলিত, অপমানিত বাবার সামনে যখন ৯ বছরের শিশু তুবা এসে দাঁড়াল, তখন সে কেবল এক কন্যাসন্তান ছিল না; মুহূর্তের মধ্যে সে আবির্ভূত হলো এক পরম মমতাময়ী ‘মা’ রূপে। সন্তানের সরল চোখ দিয়ে সে সমাজের দেয়া চোর তকমা দেখেনি, দেখেছিল সারারাত অনাহারে প্রহার ও যন্ত্রণায় কাতর তার জন্মদাতা পিতার নিদারুণ ক্ষুধা।
নিজের তিল তিল করে জমানো মাটির ব্যাংকের সামান্য কয়েনগুলো দিয়ে বাজারের দোকান থেকে চা আর বানরুটি কিনে আনল অবুঝ তুবা। উৎসুক জনতার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে, চোখের জলে ভেজা মুখে পরম আদরে নিজ হাতে বাবার মুখে তুলে দিল সেই খাবার। শৃঙ্খলিত হাত দুটি যখন অক্ষম, তখন তুবাই হয়ে উঠল তার আশ্রয়। এক ফোঁটা জলের মতো এই দৃশ্য নিমেষেই ভিজিয়ে দিয়ে গেল উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কঠোর বুক। ৯ বছরের এক ছোট্ট শিশুর এই প্রগাঢ় 'মাতৃস্নেহ' থমকে দিয়েছিল পুরো বামরাইল বাজারকে। চোর সন্দেহে নির্যাতিত বাবার মুখে নিষ্পাপ সন্তানের নিজ হাতে খাবার তুলে দেওয়ার এই বিরল আবেগঘন মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই কেঁদে ওঠে গোটা দেশ।
কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়; অবুঝ শিশুর এই মাতৃস্নেহ কেবল সাধারণ মানুষের মন জয় করেনি, নাড়া দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকেও। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে নজরে আসতেই উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা বিষয়টিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অপরাধের তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি অনুধাবন করেছিলেন এর পেছনে লুকিয়ে থাকা চরম সামাজিক অবক্ষয় ও এক অবর্ণনীয় পারিবারিক হাহাকার।
প্রশাসনিক প্রটোকলের খোলস ভেঙে এক মহৎ মানবিক তাড়নায় ইউএনও মো. আলী সুজা কালবিলম্ব না করে ছুটে যান তুবাদের জীর্ণ কুটিরে। পরম স্নেহে তুবার মাথায় হাত রেখে তিনি যেন গোটা সমাজ ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিলেন সেদিনের নির্মমতার জন্য। উজিরপুরের এই সুযোগ্য ইউএনও কেবল মৌখিক আশ্বাসেই থেমে থাকেননি, গ্রহণ করেছেন এক যুগান্তকারী ও টেকসই পদক্ষেপ।
অন্ধকারের পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরতে আকুল অনিক সরদারকে সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করতে নিজ দায়িত্বে একটি ভালো মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। একই সাথে চরম দারিদ্র্যে জর্জরিত পরিবারটির স্থায়ী আয়ের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যে শিশুটির মাতৃস্নেহ আজ দেশকে পথ দেখাচ্ছে, সেই ছোট তুবার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তায় একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অন্ধকার সংস্কৃতির মুখে দাঁড়িয়ে ৯ বছরের শিশুকন্যা তুবা আমাদের শিখিয়েছে পশুর মাঝেও কীভাবে মাতৃস্নেহ জাগিয়ে তুলতে হয়। আর উজিরপুরের মানবিক ইউএনও মো. আলী সুজা দেখিয়ে দিলেন—প্রশাসনের ক্ষমতা যখন মানবিক স্পর্শ পায়, তখন একটি ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ কীভাবে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখতে পায়। তুবাই যেন আজ এই সমাজের এক পরম মমতাময়ী ‘মা’, আর ইউএনও মো. আলী সুজা সেই আলোর রূপকার।
যা ঘঠেছিল : বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ
বাজারে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে চোর সন্দেহে আটক বাবাকে। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে বাবার কাছে কেঁদে কেঁদে ছুটে এলো ছোট্ট মেয়ে। সারারাত অনাহারে ও নির্যাতনে নিস্তেজ হয়ে পড়া বাবার জন্য নিজের জমানো টাকায় কিনে আনল রুটি আর গরম চা। এরপর নিজ হাতে পরম মমতায় বাবার মুখে তুলে দিল সেই খাবার। জাঁকজমক ভিড়ের মধ্যে বাবার চরম অসহায়ত্ব আর মেয়ের এই নিঃস্বার্থ মমতার দৃশ্য মুহূর্তেই সেখানে উপস্থিত সবার চোখ ভিজিয়ে দেয়। পরবর্তীতে এই বিরল মুহূর্তটির ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে বামরাইল বাজারের একটি দোকানে চুরির চেষ্টার অভিযোগে অনিক সরদার নামে এক যুবককে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয় নৈশপ্রহরী ও ব্যবসায়ীরা। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ধরে এনে বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে শক বেঁধে রাখে। আজ সকালে মেয়ে এসে বাবাকে রুটি-চা খাওয়ানোর সময় এক তরুণ দৃশ্যটি নিজের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। দেখতে দেখতে ভিডিওটি দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ অবুঝ শিশুটির পিতৃভক্তি ও ভালোবাসার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, মেয়েটি যখন ভিড় ঠেলে এসে নিজের হাতে বাবাকে চা-রুটি খাওয়াচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত অনেকের চোখেও পানি এসে গিয়েছিল।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রব বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে চুরির অভিযোগ পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অপরাধ যাই হোক না কেন, বাবার প্রতি অবুঝ এই কন্যাসন্তানটির মমতা আমাদের সভ্য সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
পরবর্তীতে শনিবার সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা অনিক সরদারের কাছ থেকে ভবিষ্যতে অপরাধে না জড়ানোর মুচলেকা রেখে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেন।ঘটনার বিষয়ে উজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, চুরির অভিযোগে এক যুবককে স্থানীয়রা আটকে রেখেছে খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিক মোবাইল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তবে এর আগেই স্থানীয়রা বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে মুচলেকা নিয়ে অভিযুক্ত যুবককে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
মিজান উর রহমান
সহযোগী ব্যবস্থাপনা সম্পাদক,
দৈনিক পুনরুত্থান।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: