সৌদি থেকে আর ফিরলেন না বোয়ালমারীর সুরুজ
লাশের অপেক্ষায় স্বজনদের অশ্রু
সৌদি থেকে আর ফিরলেন না বোয়ালমারীর সুরুজ
উপজেলা প্রতিনিধি, বোয়ালমারী (ফরিদপুর)
যে বাড়িতে একদিন আনন্দের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন নেমে এসেছে শোকের মাতম। পরিবারের স্বপ্ন ছিল সৌদি আরব থেকে কাজ শেষে একদিন হাসিমুখে বাড়ি ফিরবেন সুরুজ শেখ (২৭)। তাকে ঘিরে ছিল বিয়ে, সংসার আর নতুন জীবনের নানা স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। জীবিত সুরুজের বদলে এখন তার মরদেহ ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুণবহা ইউনিয়নের আখালীপাড়া গ্রামের পরিবারটি।
সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুরুজ শেখ। তিনি আখালীপাড়া গ্রামের আরব আলী শেখের ছেলে। তার মৃত্যুর সংবাদ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা ও ভাই-বোনেরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর আগে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুরুজ। রিয়াদের হুতায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। প্রবাসের কঠিন জীবনেও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। নিজের কষ্টের উপার্জনে পরিবারের জন্য কিছু করার পাশাপাশি দেশে ফিরে বিয়ে করে নতুন সংসার শুরুর পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ অসুস্থতা সবকিছু বদলে দেয়।
জুলাই মাসের শুরুতে সুরুজের পেটে তীব্র ব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। তাকে সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা পেটের অভ্যন্তরে জটিলতা শনাক্ত করেন। পরে গত ২৬ জুলাই তার অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর কিছুটা সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পরিবারও তখন আশায় বুক বেঁধেছিল—হয়তো আবার সুস্থ হয়ে কাজে ফিরবেন সুরুজ। কিন্তু সেই আশা বেশি দিন টিকল না।
প্রায় এক মাস পর অস্ত্রোপচারের সেলাই কাটতে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছে খবর পৌঁছাতেই নেমে আসে শোকের ছায়া। মুহূর্তেই যেন থমকে যায় একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।
সুরুজের লিবিয়া প্রবাসী বোনজামাই বলেন, সুরুজ খুব ভালো মনের মানুষ ছিল। পরিবারের জন্য অনেক কষ্ট করেছে। তার এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—দ্রুত আমার তার লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
নিহতের বাবা আরব আলী শেখের কণ্ঠেও অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, আমার ছেলে প্রায় সাত বছর সৌদি আরবে ছিল। পরিবারের জন্য কষ্ট করেছে। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এখন শুধু একটাই চাওয়া—ছেলের লাশটা যেন দেশে ফেরত পাই। শেষবারের মতো ছেলেকে নিজের চোখে দেখতে চাই।
সুরুজের বড় বোন রেনু পারভীন বলেন, ‘হঠাৎ করে আমার ভাইয়ের পেট ফুলে যায়। পরে সৌদি আরবের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। কিছুটা সুস্থও হয়েছিল। কিন্তু সেলাই কাটতে গিয়ে আর ফিরল না। আমার ভাই দেশে আসলে তাকে বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কত স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। এখন সেই ভাই জীবিত হয়ে নয়, লাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে, এটা ভাবতেই পারিনি’- কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
সুরুজের মা যেন ছেলের মৃত্যুর শোক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। বারবার কান্নায় মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলছেন, ‘আমার বুকের ধন আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার ছেলে তো বাড়ি আসার কথা ছিল। এখন আমার ছেলের লাশটা ফেরত চাই। একবার শুধু আমার ছেলেকে চোখের সামনে দেখতে চাই।’
সুরুজের মৃত্যুতে শুধু একটি প্রাণই হারায়নি, থেমে গেছে একটি পরিবারের অনেক স্বপ্ন। যে ছেলে প্রবাসের মাটিতে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে একদিন নিজের ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই সুরুজের ঘরে এখন অপেক্ষা শুধু তার লাশের।
পরিবারের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে সৌদি আরব থেকে সুরুজ শেখের লিবিয়ায় প্রবাসী, লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, সৌদি প্রবাসী সুরুজের পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করলে আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়ে সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার লাশ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করব।
ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের উপ পরিচালক আশিক সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের দপ্তরে নিহতের ওয়ারিশগণ আবেদন করলে সরকারি অর্থায়নে নিহত লাশ দেশে এনে পরিবারে নিকটে দেয়া হবে। বৈধ প্রক্রিয়ায় গেলে নিহতের পরিবার প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাবেন। সেই সঙ্গে এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পরে ৩৫ হাজার টাকা পাবেন তার পরিবার।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: