বোয়ালমারীতে প্রশাসনকে না জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী কাটাগর মেলার মাঠ নিলামে বিক্রি
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রুপাপাত ইউনিয়নে প্রশাসনকে না জানিয়ে ঐতিহ্যবাহী কাটাগর মেলার মাঠ প্রকাশ্যে ডাকে বিক্রি
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :
এক বছর বন্ধ থাকার পর আবার অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ৫শ বছরের ঐতিহ্যবাহী কাটাগড়ের মেলা। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে বিএনপির বিবদমান দুটি গ্রুপের মধ্যে সহিংসতা ও অনৈক্যের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ২০ গ্রামের তথা উপজেলার অন্যতম এ উৎসব দেওয়ান শাগের শাহর মেলা ও ঔরস। তবে এবার আগেভাগেই দ্বন্দ্ব সংঘাত ভুলে গিয়ে একসাথে মেলা আয়োজন করছে কাটাগড় সহস্রাইল গ্রামের লোকজন। গত রোববার সন্ধ্যায় প্রশাসনকে না জানিয়ে মেলার আয়োজক কমিটি দেওয়ান ভিটায় মেলার মাঠ ডাকের ব্যবস্থা করেন এবং মেলার মাঠ ডাকের মাধ্যমে বিক্রি করেন। এই নিয়মটা বিগত বছরগুলোই ছিল না।
কাটাগড় দেওয়ান শাগির শাহ’র মেলার ইতিহাস ঐতিহ্য অনেক পুরাতন। প্রথমে দেওয়ান শাগির শাহর পবিত্র উরশ অনুষ্ঠিত হত ১২ই চৈত্র (২৬ মার্চ)। পর্যায়ক্রমে তা গ্রামীণ মেলায় রূপ নেয়। এখন মেলা ২৫ মার্চ হতে ৩০ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলেও ২৬ মার্চ হয় বড় মেলা। বর্তমানে মেলা এ অঞ্চলের একটি বাৎসরিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সেজন্য মার্চ মাস আসতেই এলাকাবকাসি মিলেমিশে মেলা পরিচালনার জন্য ২৫ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটি করা হয়। যে কমিটির আহবায়ক করা হয় রূপাপাত ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কাটাগড় গ্রামের বাসিন্দা মো. আজিজার রহমানকে। মূল সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন শেখর ইউনয়নের চেয়ারম্যান সহস্রাইল গ্রামের বাসিন্দা কামাল আহমেদ। মেলার আগে বাণিজ্য করন না করলেও এ বছর মেলার বানিজ্যিকরণ করা হয়েছে।
মেলা উপলক্ষে আগেই খোলা ডাকের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। যেখানে মিষ্টির গলি ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, চুরি, ফিতা, কসমেটিকস ও লোহা-লক্করের গলি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, জেনারেটর ৭ লাখ ৬ হাজার টাকা, মালাই, চা, কাঁচাবাজার, হোটেলের গলি ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা, ফার্নিচারের গলি ১ লাখ ১১ হাজার টাকা, বিনোদন (বন্দুক, মোটরসাইকে, নাগরদোলা, ঘোড়া ইত্যাদি) ৩ লাখ এক হাজার ৬০০ টাকা। সব মিলে ২৯ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা মেলা মাঠ বিক্রি করা হয়েছে।
গত রোববার সন্ধ্যায় দেওয়ান শাগের শাহর মাজার প্রাঙ্গণে এ ডাক অনুষ্ঠিত হয়। দেওয়ান শাগের শাহ’র মেলার সময় কাটাগড়সহ আশেপাশের সহস্রাইল, ভুলবাড়িয়া, কলিমাঝি, মাইটকুমরা, গঙ্গানন্দপুর, ছত্রকান্দা, সুর্যোগ, বন্ডপাশা, বয়রা, বামনগাতি গ্রামগুলোতে উৎসব শুরু হয়। এ গ্রাম গুলোর অধিকাংশ বাড়িতে থাকে আত্মীয় স্বজনের সমাগম। রঙ করা নতুন মাটির পাতিলে করে সাজ-বাতাসা-কাঁঠালকুশি, চুরি-সুতা জামাই বাড়িতে পাঠানো একটি পুরাতন রেওয়াজ। এটাকে ঐতিহ্য বলা যায়। আবার নতুন ওই পাতিলে করে বৈশাখের শুরুতে জমিতে পাট বীজ বুনানো আরেকটি পুরাতন রীতি। মেলায় এক সময় শুধু মিষ্টান্ন, খেলনা, চুরি-সুতা পাওয়া গেলেও বর্তমানে প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। তাল পাতার হাত পাখা কাটাগড় মেলার বিশেষ ট্রেড মার্ক। আছে বাঁশের তৈরী জালি, ঢাকনা, ডুলি, ধামা, ঝুড়ি প্রভুতি। বাচ্চাদের খেলার সামগ্রীর সাথে পাওয়া যায় বড়দের খেলার জিনিসও। বিভিন্ন জেলা থেকে আসে নানা রঙের ফার্নিচার। সুলভ মূলে এসব ফার্নিচার দেদার বিক্রি হয়। ফার্নিচার মেলা থাকে প্রায় এক মাস। স্বল্পমূল্য থেকে শুরু করে লাখ টাকা খাট পাওয়া যায় এ মেলায়। দুরদুরান্ত থেকে আসে বিভিন্ন প্রকার মাছ।
মেলা উপলক্ষে দেওয়ানের আস্তানার চারিপাশে বসে দেওয়ান ভক্ত বাউল সাধকদের আধ্যাতিক গানের আসর। মরমী গানের সুরে মোহিত হয় দর্শক স্রোতা। আস্তানার চারপাশে তিনটি ঘর ছাড়াও দেওয়ান শাগের শাহ’র মাদ্রাসায় আসর বসায় বাউল সাধকরা। মরমী বাউল সঙ্গীত শুনতে সেখানে ভীড় করে ভক্ত ও সাধারন মানুষ। এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে আসে এসব বাউলদের খাবার দাবার। দেশের দুরদুরান্ত থেকে মানুষ মেলা দেখতে আসে। এখন বিভিন্ন এলাকার সাধারন মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা সফর বা ভ্রমন করতে আসে দেওয়ান শাগের শাহ’র মেলায়।
মেলা পরিচালনা কমিটির আহবায়ক ও রূপাপাত ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজার রহমান মোল্যা বলেন, প্রায় ৫শ বছরেরও পূর্বে থেকে মেলার শুরু। প্রথমে দেওয়ান শাগের শাহ’র পবিত্র উরশ অনুষ্ঠিত হত। পর্যায়ক্রমে তা মেলায় রূপ নেয়। বর্তমানে মেলা এ অঞ্চলের একটি বাৎসরিক উৎসব। গত বছর ঝামেলার কারণে মেলা হয়নি। তাই এ বছর আগে থেকেই এলাকাবাসি মিলে একটি কমিটি করা হয়েছে। যেখানে সবদলের সবমতের লোকজন আছে। আমাকে আহবায়ক হিসেবে রাখা হয়েছে তবে মূল সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন শেখর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ। মেলার মাঠ ডাকের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, মেলায় অনেক ধরনের খরচ আছে সেগুলো মেটাতে হয়। প্রশাসনের অনুমতি সম্পর্কে বলেন, আজ (মঙ্গলবার) অফিস খুলেছে এবং আজ অনুমতি পাওয়া যাবে। আমরা সব প্রস্তুতি শেষ করে রাখছি।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, কাটাগড়ের মেলা সম্পর্কে শুনেছি। এ এলাকার ঐতিহ্যবাহী মেলা, মানুষর আনন্দ উৎসবের একটা উপলক্ষ। ডিসি স্যার হয়তো আজ (মঙ্গলবার) মেলার অনুমতি দিবেন।
আর মেলার মাঠ ডাকের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিবো।
ফরিদপুর-১আসনের সংসদ সদস্য ড. মো. ইলিয়াস মোল্যা বলেন, যেহেতু অনেক পুরাতন মেলা এইজন্য নিষেধ করিনি। তবে বলে দিয়েছি মেলায় অশ্লীল খারাপ কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে মেলা বন্ধ হয়ে যাবে। মেলার মাঠ নিলাম করতে তারা পারে না, কোনভাবেই তারা মেলার মাঠ ডেকে বিক্রি করতে পারেনা সরকারিভাবে ছাড়া। আমি নিলাম ডাকার বিষয় নিয়ে প্রশাসনের সাথে কথা বলবো।
ফরিদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা মেলার মাঠ নিলাম ডাকা প্রসঙ্গে বলেন, এইরকম ভাবে নিলাম ডেকে দোকান বরাদ্দ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। মেলা আয়োজনে মেলা আয়োজক কমিটি খরচ বাবদ দোকানদারদের কাছ থেকে অল্প কিছু টাকা নিতে পারে। আমি বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইএনওর) সাথে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান ডেস্ক
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: