বিজয়া দশমী: আনন্দ আর বিষাদের দোলাচলে দেবী দুর্গার বিদায়, বড়নগর সাহা বাড়িতে বিষাদের ছাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহান বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো। জমকালো আয়োজন, আলোকোজ্জ্বল মন্ডপে দেবি দূর্গার আরাধনা, মহা উৎসবের মহানন্দে পার করা দিনগুলো বিষাদের ছাপ নিয়ে বিদায় হলো আগামী বছরের অপেক্ষায়। দিনটি ছিল দেবীর মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যাওয়ার দিন। অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক এই দশমী। পাঁচ দিনের উৎসবের সমাপনী দিনে মণ্ডপে মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়েছে বিদায়ের করুণ সুর, যার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে উৎসবের আনন্দ ও বিষাদ।
বুধবার (২১ অক্টোবর ২০২৬) ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের বড়নগর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাহা বাড়ির পূজা মন্ডপেও অনুরূপ আনন্দ আর বিষাদের ছাপ রেখে গেছে দেবি-দূর্গা।
বিজয়া দশমীর সকাল থেকে শুরু করে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত দিনের প্রধান আচার ও অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জন। অন্যদিনের মত বিজয়া-দশমীতেও প্রচন্ড ব্যস্ত থেকেছেন সাহা বাড়ির পুরধা-কর্তা ব্যক্তি, বিশিষ্ট সমাজ সেবক-দানবীর সুবাস সাহা। দিন শেষে দেবির বিদায়ে তার চোখে-মুখেও ফুটে ওঠে বিষাদের স্পষ্ট ছায়া। সুবাস সাহা বলেন, সাধ্য মত চেষ্টা করেছি দূর্গোৎসবকে প্রানবন্ত করতে। কমতি রাখি নাই কোনে আয়োজনে। শুধু দেবি আরাধনাই নয়, হত-দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি যথাসাধ্য। আগামী বছর শ্মরন কালের সেরাটা উপহার দেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সকালে শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে দেবীর দশমী বিহিত পূজা সম্পন্ন হয়। পূজার শেষভাগে আয়োজিত হয় দর্পণ বিসর্জন। একটি জলপূর্ণ পাত্রে দেবী দুর্গার প্রতিবিম্ব বা ছায়া ফেলে দর্পণে (আয়নায়) দেবীর চরণ দর্শন করা হয় এবং মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়। এর মাধ্যমেই দেবীর শাস্ত্রীয় বিসর্জন সম্পন্ন হয় এবং প্রতিমার ভেতরের দেবত্ব মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নেয়।
আনন্দ আর বিষাদের ‘সিঁদুর খেলায় মেতে উঠেছিলেন সাহা বাড়ির মহিলারা।
দর্পণ বিসর্জনের পর মণ্ডপগুলোতে শুরু হয় বিজয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং আবেগঘন পর্ব—সিঁদুর খেলা। বিবাহিত সনাতন নারীরা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে দেবীর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ান। এরপর দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে, মুখে মিষ্টি ও পান দিয়ে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। বড়নগর সাহা গৃহের গৃহবধূরাও তার ব্যতিক্রম করেন নাই। দল বেঁধে ধর্মীয় সকল আচার অনুষ্ঠান পালন করেছেন তাঁরা।
দেবী বরণ শেষে সাহা বাড়ির নারীরা নিজেরা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। একে অপরের গালে, কপালে সিঁদুর রাঙিয়ে দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গল কামনা করেন।
একদিকে দেবীকে বিদায় জানানোর বিষাদময় অশ্রু, অন্যদিকে একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে দেওয়ার আনন্দ—সব মিলিয়ে মণ্ডপগুলোতে এক অদ্ভুত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
দশমীর পূজা শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন, আর সমবয়সীরা মেতে ওঠেন কোলাকুলিতে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান। ঘরে ঘরে তৈরি হয় নাড়ু, নিমকি, মিষ্টিসহ নানা পদের ঐতিহ্যবাহী খাবার।
বিকেলের দিকে শুরু হয় বিজয়া দশমীর চূড়ান্ত পর্ব—শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জন। মণ্ডপ থেকে দেবী প্রতিমা সুসজ্জিত বাহনে করে বিসর্জনের ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ এবং ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ।
সূর্যাস্তের ক্ষণে স্থানীয় জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা জলের গভীরে তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমাপ্তি ঘটে বাঙালি সনাতনীদের বছরের শ্রেষ্ঠ উৎসবের।
বিজয়া দশমী মূলত আমাদের এই বার্তাই দেয়, অন্ধকার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আলোরই জয় হয়। দেবীর বিদায়ের বিষাদ বুকে নিয়েই ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা শুরু করেন আগামী বছরের—"আসছে বছর আবার হবে।"
দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
আপনার মতামত লিখুন: