• ঢাকা
  • সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertise your products here

  1. লাইফস্টাইল ও বিউটি টিপস

সবুজ পাহাড়ের মায়াবী অতিথি ‘পাহাড়ি নীলকণ্ঠ’


দৈনিক পুনরুত্থান ; প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৯:৫৫ পিএম;
সবুজ পাহাড়ের মায়াবী অতিথি ‘পাহাড়ি নীলকণ্ঠ’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

 

সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে চারদিকে যখন চিরসবুজের নীরবতা, হঠাৎ কোনো এক পাতাহীন মগডালে এসে বসে রঙিন একটি পাখি। শরীর জুড়ে যার নীলের আভা আর ডানায় সবুজের ছোঁয়া। কিছুক্ষণ স্থির থেকে আচমকাই উড়ে যায়, আবার ফিরে আসে সেই ডালে। দেখলে মনে হয়, পাহাড়ি বনের নীল আকাশ যেন ডানা মেলে নেমে এসেছে গাছের ডালে। প্রকৃতির এমন অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী এই পাখিটির নাম ‘পাহাড়ি নীলকণ্ঠ’।

বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখিদের মধ্যে পাহাড়ি নীলকণ্ঠ অন্যতম। এর ইংরেজি নাম ‘ওরিয়েন্টাল ডলারবার্ড’ (Oriental Dollarbird) এবং বৈজ্ঞানিক নাম Eurystomus orientalis। করাসিডি বা নীলকণ্ঠ গোত্রের এই পাখি মূলত এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়ার কিছু দ্বীপপুঞ্জে বিস্তৃত। উড়ন্ত অবস্থায় এদের ডানার নিচে গোলাকার রুপালি ছোপ দেখা যায়, যা দেখতে অনেকটা আমেরিকান সিলভার ডলার মুদ্রার মতো। আর এই বৈশিষ্ট্যের জন্যই পাখিটির এমন নামকরণ।
বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এদের দেখা পাওয়া বেশ কঠিন। মূলত সিলেট বিভাগের পাহাড়ি চিরসবুজ বনেই এদের প্রধান বিচরণ। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বনেও মাঝেমধ্যে এদের দেখা মিলে থাকে। সম্প্রতি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে একদল পাহাড়ি নীলকণ্ঠের ছবি ক্যামেরাবন্দী করেছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও শৌখিন ফটোগ্রাফার সাহেদ আহমেদ। তার ক্যামেরাতেই পাহাড়ি বনের এই দুর্লভ নীল সৌন্দর্যের নানা আকর্ষণীয় মুহূর্ত ধরা পড়েছে।

প্রকৃতির এই পাখির সৌন্দর্য কেবল এর রঙেই নয়, এর চলনেও রয়েছে মুগ্ধতা। সাধারণত এরা একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে। গাছের পাতাহীন উঁচু ডাল কিংবা বৈদ্যুতিক তারে বসে চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। সুযোগ পেলেই হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে পোকামাকড় শিকার করে।

বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, পাহাড়ি নীলকণ্ঠ মূলত চিরসবুজ বন ও বনের প্রান্তসীমায় বসবাস করে। এদের ডাক অনেকটা ‘ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক’ ধরনের হয়ে থাকে।

মাঝারি আকারের এই পাখিটির গলায় রয়েছে আকর্ষণীয় নীলচে আভা। বুক, পেট ও ডানায় ছড়িয়ে থাকে সবুজাভ নীল রঙ, আর শরীরের ওপরের অংশ কালচে নীল। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১২৩ থেকে ১৫০ গ্রামের মতো হয়। উড়ন্ত অবস্থায় এদের ডানার নিচের রুপালি ডিম্বাকৃতির ছোপটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। এ ছাড়া এদের ঠোঁট ও পা গোলাপি-লাল রঙের হয়ে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে প্রায় একই রকম হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঠোঁটের রঙ তুলনামূলক অনুজ্জ্বল হয়।

পাহাড়ি নীলকণ্ঠের জীবনযাপন প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়টি এদের প্রজননকাল। এ সময় তারা গাছের প্রাকৃতিক কোটরকে বাসা হিসেবে বেছে নেয় এবং সেখানে ৩ থেকে ৪টি সাদা ডিম পাড়ে। ১৭ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। জন্মের প্রায় এক মাস বয়সে ছোট্ট পাখিগুলো ডানা মেলে উড়তে শেখে। সাধারণত এদের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল পাঁচ থেকে ছয় বছর।

বাংলাদেশে নীলকণ্ঠ গোত্রের তিন প্রজাতির দেখা মিললেও ‘পাহাড়ি নীলকণ্ঠ’ যেন একটু আলাদা। এর সৌন্দর্যে মিশে আছে পাহাড়ি বনের নিজস্ব এক রহস্য। সবুজের গভীরে নীলের এমন মায়াবী উপস্থিতি সচরাচর চোখে পড়ে না। তাই সাতছড়ির বনে যখন কোনো পাতাহীন ডালে এসে বসে পাহাড়ি নীলকণ্ঠ, তখন সেই মুহূর্তটিকে মনে হয় প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা কোনো নিখুঁত ছবি।

বনের নীরবতা ভেঙে যখন তাদের ‘ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক’ ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হৃদয় জুড়িয়ে যায়। এরপর হঠাৎ ডানা মেলে আকাশে মিলিয়ে যায় রুপালি ছোপের ঝিলিক। পাহাড়ের সবুজের ভেতর আবার নেমে আসে চিরচেনা নীরবতা; আর সেই নীরবতার বুকেই চিরতরে গেঁথে থাকে পাহাড়ি নীলকণ্ঠের নীল মায়া।

দৈনিক পুনরুত্থান / পুনরুত্থান

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন